ওঙ্কার ডেস্ক: অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বন্ডি বিচে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ গুলিবর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে আতঙ্ক ও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। সমুদ্রতট সংলগ্ন এক জনবহুল এলাকায় একটি ধর্মীয় উৎসব চলাকালীন আচমকা হামলা চালায় দুই বন্দুকধারী। মুহূর্তের মধ্যে উৎসবের আনন্দ বদলে যায় রক্তাক্ত বিভীষিকায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চারদিকে ছুটোছুটি, কান্না ও সাহায্যের আর্তনাদে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সম্প্রতি দেশের নিরাপত্তা নাহিনী জানিয়েছে হামলায় মূল অভিযুক্ত নাভিদ আক্রম সরাসরি ইসলামি্ক জঙ্গী গোষ্টী আইএস এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই এর আগেও তার উপর নজরদারি চালানো হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই হামলায় অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের মধ্যে বৃদ্ধ, নারী ও শিশুও রয়েছে। হামলার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ ও বিশেষ বাহিনী। হামলাকারীদের থামাতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সেই সময় এক হামলাকারী গুলিতে নিহত হয় এবং অপরজন গুরুতর আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার হয়। আহত হামলাকারী বর্তমানে পুলিশের নজরদারিতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে নিকটবর্তী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স মোতায়েন করা হয়েছে। রক্তের চাহিদা মেটাতে সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসার আবেদন জানানো হয়েছে। ঘটনার পর বন্ডি বিচ ও আশপাশের এলাকা সম্পূর্ণ সিল করে দেওয়া হয় এবং ফরেনসিক দল তদন্ত শুরু করে।
অস্ট্রেলিয়ার বন্ডি বিচে দুইজন হামলাকারীর নাম আগেই প্রকাশ করেছে সিডনি পুলিশ। সুত্রের খবর অনুযায়ী সাজিদ আক্রম ও তার ২৪ বছরের ছেলে নাভিদ আক্রম পাকিস্তানী বংশদ্ভুত। বাবা সাজিদ আক্রম পাকিস্তানের নাগরিক, ১৯৯৮ সালে তিনি স্টুডেন্ট ভিসায় অস্ট্রলিয়ায় আসে এবং ২০০১ সালে তার ছেলে নাভিদ আক্রম অস্ট্রেলিয়ায় জন্মগ্রহন করেন। পুলিশিসুত্রে খবর, ২০১৯ সালে নাভিদের উপর নজরদারি চালানো হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টালিজেন্স অরগানাইজেশন জানায় যে ২০১৯ সালে দেশের ইসলামিক জঙ্গী গোষ্টী আইএস-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল তৎকালীন ১৮ বছর বয়সি নাভিদ। সুত্রের খবর অনুসারে আরও জানা যায়, এই সেলটি ‘ইসহাক এল মাতারি’-র সাথে যুক্ত ছিল, যাকে পরে সন্ত্রাসী বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং জেলে পাঠানো হয়েছিল।
পুলিশ আরও জানায় সাজিদ আক্রম এবং তার ছেলে নাভিদ আক্রম শহরে একটি ফলের দোকান চালাত। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে সাজিদ আক্রমের কাছে ৬টি লাইসেন্স প্রাপ্ত বন্দুক ছিল যা সে এক ক্লাব থেকে সংগ্রহ করেছিল। এছাড়াও হামলাস্থানের কাছাকাছি জায়গা থেকে দুইটি বোমা উদ্ধার পরে। পরে পুলিশি তৎপরতায় সেগুলিকে নিষ্ক্রীয় করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এই ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসবাদী হামলা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, নিরীহ মানুষকে লক্ষ্য করে এই ধরনের বর্বর হামলা গোটা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। দোষীদের কোনওভাবেই ছাড়া হবে না বলে তিনি আশ্বাস দেন। পাশাপাশি বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইন আরও কঠোর করার বিষয়েও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। সরকার মনে করছে, এই হামলার পিছনে ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনার পর অস্ট্রেলিয়া জুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পর্যটন কেন্দ্র ও জনসমাগম হয় এমন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্তরেও এই হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। বহু দেশ অস্ট্রেলিয়ার পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে। শান্তিপূর্ণ সমাজ হিসেবে পরিচিত অস্ট্রেলিয়ায় এই ধরনের রক্তাক্ত ঘটনা ফের একবার নিরাপত্তা, উগ্রবাদ এবং সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
