দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 ফ্লাইটটি তখন ৩৪ হাজার ফুট উঁচুতে। সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু ককপিটের ভিতরে তখন ঘটে চলেছে এক ভয়ঙ্কর ঘটনা, যা বদলে দিতে পারত ১৮০ জন যাত্রীর ভাগ্য। সেই মৃত্যুর মুখ থেকে সবাইকে ফিরিয়ে আনলেন দুজন – ভারতীয় পাইলট স্মিত সাবরওয়াল আর মাত্র ছয় বছরের এক শিশু, নিনা মানেস।
সেদিন বিমানের একেবারে সামনের সারিতে বসেছিল মানেস পরিবার। ইজরায়েলের বিখ্যাত ব্যাঙ্ক লিউমির সিইও টিজিভিকা মানেস, তাঁর স্ত্রী টালি আর ছোট্ট মেয়ে নিনা। উড়ানের আড়াই ঘণ্টা পর নিনা মায়ের সঙ্গে টয়লেটে যায়। টয়লেটটি ছিল ককপিটের ঠিক পাশেই।
ভিতর থেকেই ছোট্ট নিনা শুনতে পায় ককপিটে কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে। কারা যেন চিৎকার করে ঝগড়া করছে। কিছু একটা আঁচ করে সে টয়লেটের দরজা খুলেই আর্তনাদ করে ওঠে, “বাবা, আমরা মরতে চাই না!”
মেয়ের চিৎকার শুনে ছুটে আসেন বাবা টিজিভিকা। ককপিটের দিকে এগোতেই তিনি দেখেন এক রক্তাক্ত দৃশ্য।
আসলে তখন ককপিটে সহকারী পাইলট ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন পাইলট স্মিতের উপর। তাঁকে এলোপাথাড়ি কোপাচ্ছেন, আর বিমানটিকে ক্র্যাশ করানোর চেষ্টা করছেন। গুরুতর জখম হয়েও স্মিত নিজের শেষ শক্তি দিয়ে ককপিটের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিজিভিকা বলেছেন, “ককপিটের ভিতরে তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। স্মিত কোনওমতে দরজা খুলে মেঝেতে পড়ে যান, তখনও তাঁর উপর চেপে বসে হামলা চালাচ্ছিল সহকারী পাইলট।”
এই দৃশ্য দেখে আর এক মুহূর্ত দেরি করেননি টিজিভিকা। সঙ্গে আরও দুই যাত্রীকে নিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন হামলাকারীর উপর। টিজিভিকার কথায়, “আমরা তিনজন মিলে ওকে চেপে ধরি। তারপর ইয়ারফোনের তার দিয়েই ওর হাত বেঁধে ফেলি।”
এদিকে পাইলটের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বিমানটি তখন দ্রুত নিচে নামতে শুরু করেছে। কেবিনে আতঙ্ক, চিৎকার। টিজিভিকার ভাষায়, “মনে হচ্ছিল যেন ভূতের সিনেমা চলছে ভিতরে।”
ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে আসেন বিমানে থাকা দুজন অফ-ডিউটি পাইলট। তাঁরা ছুটে গিয়ে ককপিটের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং অসাধারণ দক্ষতায় বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করান।
বুধবার সকাল ৬টা ৪৯ মিনিটে দুবাই থেকে রওনা হয়েছিল বিমানটি। মাঝ আকাশে এই নৃশংস হামলায় মাথা, হাত সহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুরুতর জখম হন স্মিত। বিমানে থাকা এক চিকিৎসক যাত্রীই প্রথমে তাঁর চিকিৎসা করেন। পরে তাবুকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে দুবাইয়ে স্থানান্তরিত করা হয়।
স্মিতের এই অসম সাহসিকতার কাহিনি এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু থেকে শুরু করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু – সবাই কুর্নিশ জানিয়েছেন তাঁকে। জন্মসূত্রে গুজরাটি এই বীর পাইলটকে ‘বিশিষ্ট গুজরাত গরিমা’ সম্মান দিয়েছে গুজরাট সরকার।
আর এই গল্পের নীরব নায়িকা হয়ে থাকল ছয় বছরের নিনা, যার একটা চিৎকারই ১৮০ জন মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনল।