ওঙ্কার ডেস্ক: আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পর ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবরে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতারা একদিকে যেমন সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, অন্যদিকে শান্তি ও সংযমের আহ্বানও তুলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাকে ‘প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করে দাবি করেছেন, ইরানের দীর্ঘদিনের আগ্রাসী নীতির জবাব দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি ইরানের জনগণের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি দেশের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিতে পারে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতিনয়াহু ও এই অভিযানের পক্ষে সওয়াল করে বলেন, ইরান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছিল এবং সেই প্রেক্ষিতেই এই সামরিক পদক্ষেপ।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদামির পুতিন এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে কড়া ভাষায় নিন্দা করেছেন। মস্কোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনও সার্বভৌম দেশের শীর্ষ নেতার উপর এই ধরনের হামলা বিশ্বশান্তির জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। একই সুরে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চিনও। বেইজিং বলেছে, সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলবে এবং অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও সংলাপের পথে ফিরতে হবে।
ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলিও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, আঞ্চলিক সংঘাত যাতে আরও না ছড়ায়, তার জন্য সব পক্ষকেই সংযম দেখাতে হবে। জার্মান চ্যান্সেলর ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সামাল দিতে একটি কূটনৈতিক রূপরেখা তৈরির উপর জোর দিয়েছেন। ব্রিটিশ নেতৃত্বও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুটেরাস এই ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তিনি সব পক্ষকে অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানান। নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকেও একই বার্তা উঠে এসেছে আলোচনার টেবিলে ফিরেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে একটি উচ্চ স্তরীয় বৈঠক করেন সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৈঠকে পরই প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট ও পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন নেতিনয়াহুকে ফোন করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। সৌদি আরব, কাতার ও জর্ডন পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ওমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং তা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান হামলাকে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’র সমতুল্য বলে দাবি করেছেন এবং প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। ইতিমধ্যে ইরানের তরফে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবরও মিলেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়ায় একটি সাধারণ সুর স্পষ্ট সংঘাত যাতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ না নেয়, তার জন্য দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে সমর্থন, নিন্দা ও উদ্বেগ তিনটিই উঠে এলেও, অধিকাংশই এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার উপরই জোর দিচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার ও ভূ-রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
