ওঙ্কার ডেস্ক : পশ্চিম এশিয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ইরান-ইজরায়েল সংঘাত বর্তমানে এক ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁচেছে, যার প্রভাব পশ্চিম এশিয়ার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক মহল।
শুক্রবার স্পষ্ট ভাষায় ইরান ঘোষণা করে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনও ধরনের আপোষ তারা করবে না। ওই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইজরায়েলি বাহিনী ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পরমাণুকেন্দ্র ইসফাহান ও কোম শহরে হামলা চালায়। ইজরায়েলের দাবি, এই হামলা তাদের আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ। তবে, ইরান এই হামলাকে সরাসরি পশ্চিমের উস্কানি বলে আখ্যা দেয় এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর-সহ নানান সেনা ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
ইজরায়েলের হামলায় দক্ষিণ লেবাননে নিহত হন হিজবুল্লার শীর্ষ নেতা মহম্মদ খাদর আল-হুসেইনি। ইজরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (IDF) জানায়, হুসেইনি ইজরায়েলের হাইফা ও নাহারিয়া শহরে হামলার মূল ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে হিজবুল্লার ক্ষমতায় বড়সড় আঘাত লেগেছে বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞরা। IDF জানায়, “যে কোনও হুমকি থেকে ইজরায়েলকে রক্ষা করতে আমাদের অভিযান চলবে।”
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, পাহাড় কেটে মাটির গভীরে নির্মিত ইরানের পরমাণুকেন্দ্রে হামলার ক্ষমতা নেই ইজরায়েলের। শুক্রবার সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন, “ওদের ক্ষমতা খুবই সীমিত। ওরা ওই কেন্দ্রে খুব একটা ক্ষতি করতে পারবে না। শুধু উপরিভাগে সামান্য ভাঙচুর সম্ভব, ভিতরে যেতে পারবে না।” ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
ইরানে এখনও পর্যন্ত তিনটি সক্রিয় পরমাণুকেন্দ্র রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সংরক্ষিত ও বিতর্কিত কেন্দ্র হল ফোরদো। পাহাড় কেটে নির্মিত এই কেন্দ্রটি মাটির প্রায় ৩০০ ফুট নিচে অবস্থিত বলে অনুমান ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের। মূলত সম্ভাব্য হামলা থেকে পরমাণু কেন্দ্রকে রক্ষা করতেই এই ব্যবস্থাপনা। আগেও ফোরদো কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল ইজরায়েল, তবে রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) জানিয়েছে, তাতে কোনও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়নি।
ইজরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলার জেরে ইরানের পরমাণু বোমা তৈরির পরিকল্পনা অন্তত দুই থেকে তিন বছরের জন্য পিছিয়ে গিয়েছে, এমনটাই দাবি করেছে ইজ়রায়েল প্রশাসন। জার্মান সংবাদপত্র ‘বিল্ড’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইজরায়েলের বিদেশমন্ত্রী গিদন সার বলেন, “আমাদের কাছে যেসব তথ্য এসেছে, তাতে মনে হচ্ছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে আমরা অন্তত কয়েক বছরের জন্য পিছিয়ে দিতে পেরেছি।”
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার বহুদিন ধরেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করে এসেছে। যদিও ইরানের কাছে পরমাণু বোমা নেই, তবু ইজরায়েলের সন্দেহ, তারা দ্রুত সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে চলেছে। সেই কারণেই ইরানের পরমাণুকেন্দ্রগুলিকে লক্ষ্য করেই চালানো হয়েছে এই সামরিক অভিযান।
এই সংঘর্ষের প্রেক্ষিতে কয়েকদিন ধরে বন্ধ থাকা আকাশপথ শুক্রবার ভারতের জন্য খুলে দিয়েছে ইরান। ভারত সরকার তৎপরভাবে ‘অপারেশন সিন্ধু’ চালিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে ৫১৭ জন ভারতীয় নাগরিককে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। শুধু ভারতীয় নয়, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকদেরও ভারতীয় সহযোগিতায় ইরান থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে, জানিয়েছে তেহরানে ভারতীয় দূতাবাস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত এখন আর ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। লেবাননের হিজবুল্লা ও ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সরাসরি অংশগ্রহণ পশ্চিম এশিয়াকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করছে। অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্পের মন্তব্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ হস্তক্ষেপের ইঙ্গিতও রয়েছে। ইরান ও ইজরায়েলের সংঘাত শুধু দুই দেশের নিরাপত্তাকেই নয়, বরং গোটা পশ্চিম এশিয়া ও বিশ্বশান্তিকে বিপন্ন করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি এই সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়, তাহলে তার কুপ্রভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানির দাম এবং মানবিক নিরাপত্তার উপরও পড়বে।
