মৌসুমী পাল : গাজা যেন এখন এক অনন্ত মৃত্যু উপত্যকা। বোমা, ক্ষুধা ও নিষ্ঠুর নৈরাজ্যের মাঝে দাঁড়িয়ে শেষ নিঃশ্বাস গুনছে এক একটা শিশু, এক একটা মা। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইজরায়েল অবশেষে আকাশ থেকে খাবার বর্ষণের নামে যে ত্রাণ দেওয়ার নাটক শুরু করেছে, তা আসলে এক করুণ প্রহসনের নাম। এই সিদ্ধান্ত যতটা না মানবিক, তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক যুদ্ধকৌশলের অঙ্গ। কারণ, খাবারের থলি যত পড়ছে আকাশ থেকে, রক্তের ছোপ তার চেয়েও গাঢ় হয়ে উঠছে মাটিতে।
শনিবার রাত থেকে ইজরায়েলি সেনাবাহিনী (IDF) গাজার তিনটি অঞ্চলে সাময়িক সামরিক বিরতির ঘোষণা করেছে। সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আল-মাওয়াসি, দেইর আল-বালাহ্ এবং গাজ়া শহরে সাময়িক সংঘর্ষবিরতি। তাতে কী হচ্ছে? আকাশ থেকে ফেলা হচ্ছে ত্রাণের বস্তা যার গায়ে লেখা ‘মানবতা’, আর ভিতরে লুকিয়ে মৃত্যু। বস্তা পড়ে যাচ্ছে তাঁবুর ওপর, জখম হচ্ছেন নিরীহ, ক্ষুধার্ত মানুষ। শনিবার রাতে একটি বস্তা সরাসরি একটি ত্রাণশিবিরের উপর পড়ে আহত হয়েছেন ১১ জন। শুধু তাই নয়, সাতটি খাবারের বস্তা ফেলা হলেও গাজাবাসীর হাতে পৌঁছেছে মাত্র পাঁচটি। বাকি দুটি পড়েছে এমন স্থানে, যেখানে সাধারণ মানুষ পৌঁছতেই পারেন না। দিনের দিনের পর ক্ষুদার্থ মানুষের সঙ্গে এমন অমানবিক পরিহাস দুনিয়া ভুলে যাবে না।
ইজরাইলের নাটুকে সামরিক বিরতির সময়েও চালু রয়েছে গোলাগুলি, বোমাবর্ষণ। চিকিৎসা কেন্দ্র, ত্রাণ শিবির সবই পরিণত হচ্ছে লক্ষ্যবস্তুতে। চিকিৎসকরা জানান প্রতিদিন কর্মস্থলে অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন চিকিৎসারত ডাক্তাররা। পেট খালি, চোখে ঘুম নেই, অথচ চিকিৎসা থামালে মরবে আরও অনেকে, এই কথা ভেবেই তাঁদের কাজ থামতে পারছেন না। এমন চিকিৎসক, যাঁরা নিজেরাও কঙ্কালসার হয়ে উঠেছেন, তাঁরা এখন চিকিৎসা করছেন আরও কঙ্কালসার শিশুদের। হাসপাতালের ক্যান্টিনে খাবার নেই, জলেরও অভাব। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার কয়েক সপ্তাহে লাফিয়ে বাড়ছে।
অপরদিকে ইজরায়েলি প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই ত্রাণে হামাস উপকৃত হচ্ছে সেই কারণেই সীমিত ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে। অথচ বাস্তবে এই নীতিই গাজাকে ঠেলে দিচ্ছে এক ভয়ঙ্কর, পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষের দিকে। রাষ্ট্রপুঞ্জ, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া সহ একাধিক দেশের সরকার তীব্র নিন্দা করেছে ইজরায়েলের এই নির্লজ্জ নিষ্ঠুরতার। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, “এ এক অবর্ণনীয় মৃত্যু ও ধ্বংসের স্তর, যার তুলনা ইতিহাসে নেই।”
ত্রাণ বিতরণের নামে ইজরায়েল আসলে চালাচ্ছে নতুন এক ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’। ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবারের লোভ দেখিয়ে আকাশ থেকে বস্তা ফেলে অসহায়তার চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। এতে মানবিকতা নেই, আছে নিষ্ঠুরতম রাজনীতি। যুদ্ধের নামে যে চূড়ান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘন চলছে গাজায়, তা আর অস্বীকারের জায়গায় নেই।
বিশ্ব আজ গাজার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই এই অব্যাহত হাহাকার, এই রক্তাক্ত ক্ষুধা আর কত দিন? আর কত প্রাণ গেলে বিশ্ব কাঁদবে? যুদ্ধ নয়, এখন প্রয়োজন শর্তহীন শান্তি, অবিলম্বে পূর্ণ মাত্রায় ত্রাণ পৌঁছনোর নিশ্চয়তা এবং ইজরায়েলের বিরুদ্ধে কড়া আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ। না হলে ইতিহাস একদিন হিসেব চাইবে, এই নরকের মত বিভীষিকার নেপথ্যে ছিল কারা, কারা চুপ ছিল ?
