নিজস্ব সাংবাদিক : কেউ ডাকত “দাদা”, কেউ দাদার প্রভাব দেখে সন্মান জানাতে স্যালুট ঠুকতো। কসবা ল’ কলেজ জুড়ে তার নামে প্রিন্সিপাল থেক পিয়ন ভয়ে কাঁপতো। আর বুক ফুলিয়ে রাজত্ব করতো ‘এমএম’। এমএম-এর পুরো নাম মনোজিৎ মিশ্র। তবে মনোজিতের এটাই যে প্রথম কুকীর্তি তা নয়, এর আগেও একাধিক অভিযোগে নাম তুলেছে সে। তার বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি অভিযোগের রেকর্ড রয়েছে। আর এসব কাণ্ডের শক্তি যে তার রাজনৈতিক যোগ সূত্রের কারণে তাও স্পষ্ট হচ্ছে। তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতাদের সঙ্গে সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ ছবিগুলিই যে তার দুষ্কর্মের ছাড়পত্র হিসেবে ব্যবহার করতো এমন কথাও উঠছে। ২০১২ সালে এই আইন কলেজে ভর্তি হওয়ার এক বছরের মধ্যেই ছুরি মারার ঘটনায় তার নামজড়ায়। ২০১৪ সালে ডিসকলেজিয়েট করা হলেও ২০১৭ সালে সে আবারও ভর্তি হয়। কোন ক্ষমতায় তার এই পুনরাবর্তন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ঘটনার মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র, কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং অস্থায়ী কর্মী। ২৫ জুন রাতে কলেজ চত্বরে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনায় তার সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছে আরও দুই ছাত্র। অভিযোগ, মনোজিতের বিয়ের প্রস্তাব ওই ছাত্রী প্রত্যাখ্যান করায় ধর্ষণকেই প্রতিশোধ হিসেবে বেছে নেয়। যার জেরে এই ভয়াবহ যৌন নিগ্রহে সামিল হতে পিছ পা হয়নি মনোজিৎ, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। নির্যাতিতার অভিযোগ থেকে যে বিবরণ পাওয়া গেছে তাতে অভিযুক্তের যে চরম পাশবিক আক্রোশ ফুটে উঠেছে, তাতে ক্ষমতার এক বেপরোয়া পরিণতি ফুটে উঠেছে। নির্যাতনের বহিঃপ্রকাশ এবং ভয় দেখানোর অনুষঙ্গ বলে দিচ্ছে মনোজিৎ নিজেকে এক অসীম ক্ষমতাধর হিসেবে মনে করতো। গোটা কলে জুড়ে মনোজিৎ শুধু একজন তৃণমূল ছাত্রনেতা ছিল তা নয়, সে হয়ে উঠেছিল একটা ‘ভয়ের প্রতীক’। ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে শিক্ষক, কর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সব কিছুই নিজের কায়েমে রাখতো—সবই ছিল তার ‘দাদাগিরির’ আওতায়। কলেজের দেয়ালে আজও লেখা রয়েছে “টিম এমএম”, “মনোজিৎ দাদা তুমি আমাদের হৃদয়ে আছ”—এই ‘ভক্তি’ আদৌ কি স্বতঃস্ফূর্ত, নাকি ভয়প্রসূত ? এসব থেকে মনে করা হচ্ছে, সে ছিল গোটা কলেজ ব্যবস্থার ছায়া শাসক। প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে দিনের পর দিন কলেজের অন্দরমহলে এমন এক আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি গড়ে উঠলো, যেখানে একজনের কথাই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায় ? যদিও তৃণমূল নেতৃত্ব থেকে শুরু করে বিরোধী দল—সকলেই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে। তবুও প্রশ্ন, এসব কি শুধু এই একটা সময়ের জন্য হয়েছে ? এতসব ঘটনার চক্রী যে তার খবর কেউ রাখেনি এটা বলা ভুল হবে। দিনের পর দিন প্রশ্রয় না পেলে এভাবে কেউ অপরাধ প্রবণ হয়ে উঠতে পারে না।
তৃণমূলনেত্রী তথা রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা বলেছেন, “কোনও বাঁদরামি সহ্য করা হবে না।” তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ জানিয়েছেন, “কঠোরতম শাস্তি হওয়া উচিত।” কিন্তু এখানেই প্রশ্ন—যদি ২০১২ সাল থেকেই মনোজিৎ মিশ্রের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকে, তাহলে কেন তাকে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছিল ? তার আগের অপরাধগুলোর কি যথাযথ তদন্ত হয়েছিল ? কি কারণে গ্রেফতারযোগ্য অপরাধ করা সত্ত্বেও বুক ফুলিয়ে এতদিন ঘুরে বেড়িয়েছে মনোজিৎ ? কালীঘাটের এই বেপরোয়া তরুণের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক চালচলন কেউ জানতো না এটা কি হতে পারে ?
ঘটনার পর কসবা ল কলেজে ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেছে। ছেঁড়া চুল, রক্তের দাগ—সবই এখন প্রমাণস্বরূপ। কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মাও কলেজে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। সূত্রের খবর, ধৃতদের মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা হবে। ঘটনার পর সমাজে যে প্রশ্নগুলো দানা বাঁধছে, তা শুধু আইনশৃঙ্খলা বা ন্যায়ের পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। কলেজ প্রশাসন কি করছিল এতদিন ? একজন ছাত্রনেতা কি ভাবে সঘোষিত শাসকে পরিণত হলেন ? রাজনীতির ছত্রছায়া কি অপরাধীদের আড়াল করে দিচ্ছে ? এতে ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা কি বজায় থাকছে ? এমন ভুরি ভুরি প্রশ্ন উঠে আসছে। তাই এই ধর্ষণের ঘটনাটি শুধু একটি আইন বা বিচারকেন্দ্রিক থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, সামাজিক, প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক অচলায়তনের ছবি।
