নিজস্ব সংবাদদাতা : কসবার আইন কলেজে ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনার তদন্ত আরও গতি পেয়েছে। ঘটনার মূল অভিযুক্ত মনোজিত মিশ্র, তাঁর বাড়ি থেকে ঘটনার সময় তাঁর পরনে যে পোশাক ছিল তা উদ্ধার করেছে কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)। ঘটনার সময় মনোজিত যে ওই জামা পরেছিল তা সিসিটভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গিয়েছিল। রবিবার অভিযুক্ত তিন জনের বাড়িতেই তল্লাশি চালায় সিট। মনোজিতের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে লাল রঙের কুর্তা, খয়েরি রঙের ছ’পকেটের প্যান্ট এবং একটি কালো শর্টস। সিসিটিভি ফুটেজে ঠিক এই পোশাকেই দেখা গিয়েছিল অভিযুক্তকে। উদ্ধার হওয়া পোশাকগুলি ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই পোশাকগুলি ঘটনাস্থলের প্রমাণের সঙ্গে মেলালে গুরুত্বপূর্ণ ক্লু মিলতে পারে।
সিটের নেতৃত্বে রয়েছেন কলকাতা পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার (দক্ষিণ শহরতলি) প্রদীপকুমার ঘোষাল। প্রথমে পাঁচ সদস্যের এই বিশেষ দল গঠিত হলেও রবিবার থেকে তাতে আরও চার জনকে যুক্ত করা হয়েছে। নতুন সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন এক মহিলা অফিসারও, যিনি নির্যাতিতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। অভিযুক্তদের বাড়ি থেকে পোশাক ছাড়াও আরও কিছু নমুনা এবং তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। মোবাইল ছাড়া অন্য কোনও বৈদ্যুতিন যন্ত্র তাঁরা ব্যবহার করেছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য নির্যাতিতাকে কলেজে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। সেখানেই ঘটনার পুরো বর্ণনা আবারও দেন তরুণী। সিট তাঁর বয়ান রেকর্ড করেছে। তিনি জানিয়েছেন, কলেজের রক্ষীর ঘরেই তাঁকে বারবার ধর্ষণ করা হয়েছিল। সেই সময় মাথায় আঘাত লাগে। বারবার অনুরোধ করার পরও থামেনি নির্যাতন। মৃতপ্রায় অবস্থায় থাকায় শেষ পর্যন্ত আর বাধা দিতে পারেননি তিনি, দ্রুত কলেজ চত্বর থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। তিনি অভিযোগপত্রে এবং বয়ানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, হকি স্টিক দিয়ে তাঁকে মারার চেষ্টাও করা হয়েছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, কলেজের রক্ষীর ঘর থেকে সেই হকি স্টিক উদ্ধার করা হয়েছে। সেখান থেকে ছিঁড়ে যাওয়া কিছু চুলও পাওয়া গেছে। প্রাথমিক অনুমান, ধস্তাধস্তির সময় এই চুল ছিঁড়ে যেতে পারে। এগুলিও ফরেন্সিক টেস্টের জন্য পাঠানো হবে। সিটের এক আধিকারিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ঘটনার দিন রক্ষীর ঘরেই বেশ কিছুক্ষণ ধরে এই পাশবিকতা চলেছিল। সেই সময় রক্ষীও উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু কোনওরকম সাহায্য করেননি বলেই অভিযোগ নির্যাতিতার পরিবারের। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে রক্ষীর উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অসঙ্গতিপূর্ণ উত্তর দেওয়ায় ওই নিরাপত্তারক্ষীকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজ এবং ফরেন্সিক রিপোর্টের ভিত্তিতে তদন্ত দ্রুত এগোতে চাইছে সিট। পুলিশের একাংশ মনে করছে, পুরো ঘটনার পিছনে পূর্বপরিকল্পিত চক্রান্ত থাকতে পারে। তাতে আর কেউ জড়িত কি না, তাও দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আরও তথ্যপ্রমাণ জোগাড়ের চেষ্টা চলছে। কলেজ চত্বরে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ২৫ জুন দুপুর সাড়ে তিনটে থেকে রাত প্রায় এগারোটা পর্যন্ত অভিযুক্তরা ওই এলাকায় ছিল। প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে কলেজ চত্বরে চলেছে সমস্ত ঘটনা। পুনর্নির্মাণের সময় কলেজের নির্দিষ্ট ঘর ঘুরে ঘুরে দেখানো হয়েছে কীভাবে তরুণীকে প্রথমে ইউনিয়ন রুমে নিয়ে গিয়ে হেনস্থা করা হয়, তার পর রক্ষীর ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, নির্যাতিতা যা যা অভিযোগপত্রে লিখেছিলেন, তার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে ফুটেজের ছবি।
এই ঘটনার পর থেকেই কলেজ চত্বরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। কীভাবে কলেজের ভিতরে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তা নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। ঘটনার নিন্দা করে অভিযুক্তদের কঠোরতম শাস্তির দাবি তুলেছেন বহু সমাজকর্মী ও শিক্ষার্থী। উঠে আসছে আর জি করের সেই নির্মম ঘটনারও অতীত। কলকাতা পুলিশ আশ্বাস দিয়েছে, দ্রুত এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে সমস্ত দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হবে।
