ওঙ্কার ডেস্ক: গত ৩০ মে দক্ষিণ কলকাতার গলফ্ গ্রিনে এক আবাসিক ফ্ল্যাট থেকে এক যুগলের মৃতদেহ উদ্ধারের পর চাঞ্চল্য ছড়ায় এলাকায়। প্রাথমিক পর্যায়ে মৃতার পরিবারের তরফ থেকে খুনের অভিযোগ উঠলে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে ঘটনার দিন ঐ আবাসিকে আরও তিনজন উপস্থিত ছিল। এবং ঘর থেকে একাধিক মাদক দ্রব্য উদ্ধার করে পুলিশ। এবার ময়না তদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী মৃত্যুর কারণ হিসাবে মাত্রাতিরিক্ত মাদকসেবন উল্লেখ করেছে পুলিশ।
ঘটনায় তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্যের সন্ধান পেয়েছে কলকাতা পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, যে ফ্ল্যাট থেকে মহম্মদ দিলশাদ ও মেহুলি সান্যালের দেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, সেটি নিয়মিতভাবে মাদক, মদ্যপান এবং তথাকথিত ‘হাউস পার্টি’-র আড্ডাখানা হিসেবে ব্যবহৃত হত। সেখানে তরুণ-তরুণীদের নিয়ে রাতভর পার্টির আয়োজন করা হতো এবং মাদক সেবনের পাশাপাশি অশ্লীল রিল ভিডিও তৈরি করা হত বলেও অভিযোগ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার ওই ফ্ল্যাট থেকে দিলশাদ ও তার বান্ধবী মেহুলি সান্যালের দেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর মেহুলির মা অভিযোগ করেন, তাঁর মেয়েকে খুন করা হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে এবং একই দিনে মুশতাক আলি মোল্লা ওরফে রোহিত, অঞ্জলি বাঙ্গিরো এবং চন্দন পাসোয়ান নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তকারীদের দাবি, শনিবার রাতে ফ্ল্যাটে একটি হাউস পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন দিলশাদ, মেহুলি, মুশতাক, অঞ্জলি এবং চন্দন। দীর্ঘ সময় ধরে পার্টি চলার পর রবিবার সকালে দু’জনের মৃত্যু ঘটে। চন্দন শনিবার বিকেলেই ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, অতিরিক্ত মাত্রায় মাদক গ্রহণের ফলেই মৃত্যু হয়েছে যুগলের। রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রথমে মেহুলির মৃত্যু হয় এবং কিছুক্ষণ পরে মারা যান দিলশাদ। মেহুলির মাথায় যে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে, তা পড়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে বলেই চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা। সোমবার ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল। তারা ফ্ল্যাট থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে। কোন ধরনের মাদক সেবন করা হয়েছিল এবং তার পরিমাণ কত ছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সেখানে অশ্লীল ভিডিও তৈরি করা হত কি না, তাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
পুলিশের দাবি, দিলশাদের ভাড়া নেওয়া ওই ফ্ল্যাটে নিয়মিতভাবে এক বা একাধিক দিন ধরে পার্টির আয়োজন করা হতো। সেখানে অংশগ্রহণকারী তরুণ-তরুণীরা অবাধে মদ ও মাদক সেবন করতেন। বিনিময়ে দিলশাদকে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হতো, যা একটি নির্দিষ্ট ‘প্যাকেজ’-এর অংশ ছিল বলে তদন্তকারীদের ধারণা। তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, ২০২৩ সালে মেহুলি নিজের বাড়ি ছেড়ে এক যুবকের সঙ্গে চলে যান। এরপর তিনি বিভিন্ন সঙ্গীর সঙ্গে বসবাস করেছেন বলে পুলিশের দাবি। শেষবার তাঁকে মুশতাকের সঙ্গে লিভ-ইন সম্পর্কে দেখা গিয়েছিল। দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন হাউস পার্টি ও রেভ পার্টির সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। সেই সূত্রেই অঞ্জলির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
পুলিশ এখন পুরো চক্রের কার্যকলাপ, মাদকের উৎস, আর্থিক লেনদেন এবং পার্টিগুলির প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। যুগলের মৃত্যু নিছক মাদকাসক্তির ফল, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, ফরেন্সিক রিপোর্ট এবং ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণের পরই ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।