ওঙ্কার ডেস্ক: বাংলার প্রাচীন শিক্ষা পরম্পরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল টোল বা চতুষ্পাঠী। একসময় এই টোলগুলিই ছিল সংস্কৃত ভাষা, ব্যাকরণ, দর্শন, শাস্ত্র এবং ভারতীয় জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার এবং সরকারি উদাসীনতার অভিযোগে বাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে বলে দাবি পণ্ডিত ও অধ্যাপকদের। এই সমস্ত সমস্যার সমাধানের দাবিতে এবার একজোট হয়েছেন বাংলার সংস্কৃতসেবী পণ্ডিত ও অধ্যাপকেরা। ঠাকুর ওঙ্কারনাথ সীতারাম প্রতিষ্ঠিত মহামিলন মঠে কিংকর শোভন মহারাজের উদ্যোগে নিখিল বঙ্গ সংস্কৃত সেবী সমিতির শতাধিক পণ্ডিত ও অধ্যাপক জমায়েত হন। প্রাচীন এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে কীভাবে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, তা নিয়েও মতবিনিময় করেন তাঁরা।
সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে ভারতের প্রাচীন জ্ঞানচর্চার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। একসময় শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে সংস্কৃতের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। বাংলাতেও সংস্কৃত শিক্ষার দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। টোলগুলিতে ছাত্ররা ব্যাকরণ, কাব্য, ন্যায়, দর্শন, বেদান্ত, স্মৃতি-সহ বিভিন্ন শাস্ত্রে শিক্ষা লাভ করতেন। বাংলার বহু বিশিষ্ট মনীষীর শিক্ষাজীবনের সঙ্গেও এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থার যোগ রয়েছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলার জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে যাঁদের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়, তাঁদের সময়েও টোল ছিল শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু বর্তমানে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই সংকটের মুখে বলে অভিযোগ উঠেছে। পণ্ডিতদের দাবি, ২০০৭ সালের দিকে বাংলায় প্রায় ৯০০টি টোল ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ২৩৫টির কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। একের পর এক টোলের অস্তিত্ব সংকটে পড়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, আগামী দিনে বাংলার এই প্রাচীন শিক্ষা ব্যবস্থা আদৌ কতটা টিকে থাকবে। শুধু টোলের সংখ্যা কমে যাওয়াই নয়, যে প্রতিষ্ঠানগুলি এখনও চালু রয়েছে, সেগুলির পরিকাঠামো নিয়েও রয়েছে একাধিক অভিযোগ।
এই পরিস্থিতিতে টোলের পণ্ডিত ও অধ্যাপকদের আর্থিক অবস্থাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো নিয়ে সমস্যা রয়েছে। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও পরিষেবা কাঠামোর উন্নতি হয়নি। এর ফলে বহু পণ্ডিত ও অধ্যাপক নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। নতুন প্রজন্মের শিক্ষিতদের মধ্যেও টোলের শিক্ষকতা পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার আগ্রহ কমে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি। বর্তমানে রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তনের আশা করছেন পণ্ডিতেরা। তাঁদের দাবি, সরকারের কাছে টোলগুলির সমস্যা তুলে ধরার পাশাপাশি সংস্কৃত শিক্ষার প্রসার ও সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রয়োজন। সেই উদ্দেশ্যেই তাঁরা একত্রিত হয়ে রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে ডেপুটেশন দেন।