অসীম সেন
যখন খুব জোরে প্রেম পায়, কানে বেজে ওঠে ‘লগ যা গলে সে ফির ইয়ে হাসিন রাত হো না হো।‘ বেনজাইতেন যেন বিওয়া হাতে সুর তুলছেন স্বপ্নের ওপারে এনোশিমা দ্বীপে। সাত সাতটি দশক গোটা ভারতের প্রেম বিরহ আনন্দ যন্ত্রণার অনুভূতিগুলিকে সুরের আকার দিয়েছিলেন লতা মঙ্গেসকর। সুরের নাইটিঙ্গেল, মেলোডি কুইনের মত হাজার হাজার বিশেষণ দেওয়া যেতে পারে। সহজ কথাটা হল সুরের রঙ দিয়ে অনন্ত ক্যনভাসে জীবন আঁকতেন লতা মঙ্গেসকর।
পরিবারেই সুর ছিল। বাবা পণ্ডিত দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন নামী ধ্রুপদি সঙ্গীত শিল্পী। ছোট বেলায় আদরের নাম ছিল হেমা। পরবর্তী কালে বাবার নাটকের চরিত্র অনুসারে নাম পান লতা। তের বছর বয়সে হঠাৎই বাবার মৃত্যু। সংসার টানতে বাধ্য হয়ে পা রাখতে হয়েছিল অভিনয়ের দুনিয়ায়। ১৯৪১ সালে প্রথম রেডিওতে গান। গলাটা অতিরিক্ত চিকন। রিজেক্ট করা হয়েছিল।
এরপরে থেমে যেতে পারত তাঁর সুরের জীবন। কিন্তু সকল উপন্যাসের প্রচ্ছদপট তো একরকম হয় না। ওস্তাদ আমান আলী খান জেন্ডিওয়ালের মত গুণীজনের কাছে তালিম নিয়ে আমুল বদলে ফেলেন নিজেকে। যার নামে ভারতের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি আন্দোলিত হত, গোটা জীবন তিনি কিন্তু রেকর্ডিং স্টুডিওতে জুতো পায়ে গান গাননি। উপাসনালয় মনে করতেন স্টুডিওকে। নিজের রেকর্ডিং করা গান নিজে শোনেননি অসংখ্য ভুল ধরা পড়ার ভয়ে।
লতাজিকে নিয়ে এরকম হাজার কাহিনি রয়েছে। ৩৬ টির বেশি আঞ্চলিক ও বিদেশি ভাষায় ত্রিশ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেছেন। যুগে যুগে সে গান মানুষকে কাঁদিয়েছে, হাসিয়েছে, আপ্লুত করেছে।ভারত-চিন যুদ্ধের পর জওহরলাল নেহেরুর উপস্থিতিতে ‘এ মেরে ওয়তন কে লোগোঁ’ দেশাত্মবোধক সঙ্গীতের একটি প্যারামিটার তৈরি করে দিয়েছিল। শুধু গায়িকা হিসেবে নন। গোটা সুরের জগত তাঁকে সম্মান দিত অভিভাবক হিসেবে।
পুরুষ শিল্পীদের সমান পারিশ্রমিকের দাবিতে সে সময়ে সোচ্চার হয়েছিলেন তিনি। তাঁর আপসহীন মানসিকতা এখনও রূপকথার গল্পের মত ছড়িয়ে আছে বলিউডের অলিতে গলিতে। লতা মঙ্গেসকরের কন্ঠ স্বচ্ছ স্ফটিকের মত। জাভেদ আখতার বলেছিলেন সুর সাম্রাজ্ঞী প্রসঙ্গে। লন্ডনের রয়্যাল আ্যালবার্ট হলে প্রথম ভারতীয় শিল্পী হিসেবে পারফর্ম করেছিলেন তিনি।
ভারত রত্ন, দাদাসাহেব ফালকে, ফ্রান্স সরকারের দেওয়া অফিসার অব দ্য লেজিওন অব অনারের মত পালক রয়েছে তাঁর মুকুটে। ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সমাজমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় প্রধানমন্ত্রী জানালেন লতা মঙ্গেসকর বিশ্বের দরবারে ভারতের নাম উজ্জ্বল করেছে। ভারতীয় সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তাঁর অনন্য অবদান আগামী দিনেও স্মরণ করা হবে বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। লতা মঙ্গেসকর আজকের দিনেও সমান প্রাসঙ্গিক, যতটা ছিলেন আজ থেকে অর্ধশতবর্ষ আগে। আবেগের গাণিতিক সূত্র গুলি তাঁর গান হয়ে আজও সাজানো আছে কোটি হৃদয়ের প্যান্ডোরা বক্সে।