ওঙ্কার ডেস্ক : পেগাসাসের দৃষ্টান্ত টেনে বিরোধীদের প্রবল চাপের মুখে ‘সঞ্চার সাথী’ ইস্যুতে পিছু হটলো কেন্দ্র। দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের মধ্যে ‘সঞ্চার সাথী’ অ্যাপ নিয়ে বুধবার লোকসভায় বিবৃতি দিলেন যোগাযোগ মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। বললেন, “সঞ্চার সাথী সাইবারসিকিউরিটি অ্যাপটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য অ্যাক্সেস করার জন্য ব্যবহার করা যাবে না।” একইসঙ্গে,সঞ্চার সাথী অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকদের ওপর ‘নজরদারি’ চালানোর অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় যোগাযোগ মন্ত্রী। তিনি বলেন, “সঞ্চার সাথী দিয়ে কারও ওপর নজরদারির সুযোগ নেই। চাইলে অন্য যে কোনও অ্যাপের মতো এটিও মুছে ফেলা যাবে। ইচ্ছা না থাকলে এটি সক্রিয় করার দরকার নেই। এটাই গণতন্ত্রের অধিকার।”
সোমবারের নির্দেশ নিয়ে ওঠা আপত্তির পর মন্ত্রী তাঁর এক্স পোস্টেও লিখেছিলেন – অ্যাপটি সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় রাখা সম্পূর্ণ ব্যবহারকারীর ইচ্ছা। এমনকী সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে তিনি গুগল ম্যাপ-এর উদাহরণ টেনেও বলেছিলেন, “ফোনে অনেক অ্যাপ থাকে। আপনি চাইলে ব্যবহার করবেন, না চাইলে রাখবেন না।”
ভারতে বিক্রি হওয়া সব স্মার্টফোনে ‘সঞ্চার সাথী’ অ্যাপটি প্রি-ইনস্টল করা থাকতে হবে। গত ২৮ নভেম্বর কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ফোন প্রস্তুতকারী সব সংস্থাকে এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। গ্রাহকদের মোবাইলে অ্যাপ ডাউনলোডের লিঙ্ক পাঠানোও শুরু হয়। এরপরই বিরোধীরা প্রবল সোচ্চার হন। তাঁদের অভিযোগ, আগাম ইনস্টল থাকা অ্যাপ মুছেও তার ফিচার পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয় কি না, সাধারণ ব্যবহারকারীর জানার উপায় নেই। ফলে গোপনে সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এর আগে পেগাসাস নিয়ে বিশ্ব জুড়ে বিতর্কের ঢেউ ওঠে। সেই দৃষ্টান্ত তুলে বিরোধীরা একে নতুন ‘নজরদারি টুল’ বলে গলা চড়ান। কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, “বিষয়টি হাস্যকর। নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের চেষ্টা চালাচ্ছে কেন্দ্র। দেশকে একনায়কত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।” কয়েক কদম এগিয়ে কংগ্রেস সাংসদ কার্তি চিদম্বরম বলেন, “রাশিয়া, উত্তর কোরিয়ার মতো নজরদারি ব্যবস্থা এ দেশে আনা হচ্ছে। আমাদের ব্যক্তিগত ছবি-তথ্যে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
বিরোধীদের অভিযোগ সঞ্চার সাথী অ্যাপের মাধ্যমে কেন্দ্র দেশের নাগরিকদের উপর ‘গুপ্তচরবৃত্তি’র ফাঁদ পাততে চাইছে। এরই প্রেক্ষিতে সিন্ধিয়া বলেন, “সঞ্চার সাথী সেফটি অ্যাপ দিয়ে গুপ্তচরবৃত্তি সম্ভব নয়, হবেও না।” এদিন সংসদে যোগাযোগ মন্ত্রী আরও বলেন, “আমি অন্য যেকোনো অ্যাপের মতো এটিও মুছে ফেলতে পারি… কারণ গণতন্ত্রে প্রতিটি নাগরিকের এই অধিকার আছে। আমরা এই পদক্ষেপ নিয়েছি যাতে এটি সকলের কাছে অ্যাক্সেসযোগ্য হয়। অ্যাপটির সাফল্য জনসাধারণের অংশগ্রহণের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখন, জনসাধারণের প্রতিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে, আমরা ক্রম পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত।”
এই বিষয়ে যোগাযোগ মন্ত্রী X-এ একটি পোস্টে জানিয়েছিলেন, “এটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা – ব্যবহারকারীরা অ্যাপটি সক্রিয় করতে এবং এর সুবিধাগুলি গ্রহণ করতে পারেন, অথবা যদি তারা না চান, তবে তারা যে কোনও সময় এটি মুছে ফেলতে পারেন।”
তিনি সংসদের বাইরে সাংবাদিকদেরও একই কথা বলেন। উদাহরণ হিসেবে গুগলের ম্যাপস অ্যাপের উল্লেখ করে বলেন, ” যখন আপনি একটি ফোন কিনবেন, তখন অনেক অ্যাপ আগে থেকে ইনস্টল করা থাকে। গুগল ম্যাপও আসে। এখন, যদি আপনি এটি ব্যবহার করতে না চান তাহলে তা মুছে ফেলতে পারেন।”
কংগ্রেস সাংসদ দীপেন্দ্র সিং হুডা বলেন, “কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেছিলেন যে এটি আগে থেকে ইনস্টল করা থাকবে। কিন্তু পরে তিনি বলেছিলেন যে ব্যবহারকারী এটি মুছে ফেলতে পারবেন। যখন একটি আগে থেকে লোড করা অ্যাপ মুছে ফেলা হয়, তখন ব্যবহারকারীরা জানতেও পারবেন না যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য অক্ষম করা হয়েছে কিনা। এটি কি গোপনীয়তার উপর আক্রমণ নয় ? স্নুপিং নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।” সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করছিল যে সঞ্চার সাথী অ্যাপটি যদি তাদের ফোনে নিষ্ক্রিয় থাকে, তবুও এটি গোপনে সক্রিয় করা যেতে পারে। এদিন দীপেন্দ্র সিং হুডার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, “আমরা একটি বিকল্প দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি… যদি অ্যাপটি আপনার ফোনে থাকে, তবে এর অর্থ এই নয় যে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করবে। যতক্ষণ না ব্যবহারকারী অ্যাপটিকে সক্রিয় করছেন, ততক্ষণ এটি কাজ করবে না।”
প্রত্যুত্তরে কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রা বলেছেন, “এটি হাস্যকর। নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকার রয়েছে। এটি কেবল টেলিফোনে নজরদারি করার বিষয়ে নয় – সামগ্রিকভাবে, তারা এই দেশকে একনায়কতন্ত্রে পরিণত করছে।” উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা গোষ্ঠীর প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী একে “আরেকটি বিগ বস নজরদারি মুহূর্ত” বলে অভিহিত করেছেন।
