কলকাতা: উপনির্বাচনের প্রচারে গিয়ে বারবার সংখ্যালঘু ভোটারদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ফলাফল বলছে, সেই হাতই ধরেছে মুসলিম অধ্যুষিত রেজিনগর। শুধু রেজিনগর নয়, নন্দীগ্রামের সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশও গিয়েছে বিজেপির ঝুলিতে। ফল প্রকাশের পর মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া, “বন্ধুত্ব বানিয়ে নিয়েছেন”। এই বার্তা যে মুসলিম ভোটারদের উদ্দেশেই, তা স্পষ্ট। যদিও বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, এটি জনমত নয়, বিজেপি ভোট লুট করে জিতেছে।
রেজিনগরে ভাঙল ৭০ শতাংশের সমীকরণ-
নন্দীগ্রামে বিজেপির জয় একরকম নিশ্চিত ছিল, প্রশ্ন ছিল শুধু ব্যবধান নিয়ে। কিন্তু রেজিনগর নিয়ে জল্পনা ছিল তুঙ্গে। কারণ এই কেন্দ্রে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার মুসলিম, যা এতদিন তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি বলেই পরিচিত ছিল। কিন্তু এবারের ফলাফলে সেই মিথ ভেঙে গিয়েছে। শুভেন্দুর মতে, রেজিনগরের মুসলিম ভোটাররা বিভাজনের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে উন্নয়নের পক্ষে ভোট দিয়েছেন এবং সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছেন।
ভোটের অঙ্কে রেকর্ড-
নন্দীগ্রামে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ পেয়েছেন ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৪২৭ ভোট। দ্বিতীয় স্থানে কংগ্রেসের মিলন প্রধান, তাঁর প্রাপ্ত ভোট ৪১ হাজার ৬৭৪। ফলতার উপনির্বাচনে বিজেপি ১ লক্ষ ৯ হাজার ২১ ভোটে জয়ের যে রেকর্ড গড়েছিল, তা ভেঙে দিয়েছে নন্দীগ্রাম। এখানে বিজেপির জয়ের ব্যবধান ১ লক্ষ ২২ হাজার ৭৫৩।
রেজিনগরেও বড় জয়। বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার জিতেছেন ৭০ হাজারেরও বেশি ভোটে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এই জয়ের পিছনে বড় ভূমিকা রয়েছে অন্নপূর্ণা যোজনার মহিলাদের। তাঁর কথায়, “হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে নন্দীগ্রামের ৭০ হাজার ৩০০ এবং রেজিনগরের প্রায় ৭০ হাজার অন্নপূর্ণা প্রাপক মহিলা পরিবার নিয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। রেজিনগরের ৩৫ হাজার সংখ্যালঘু অন্নপূর্ণা প্রাপক দিদি-বোনেরা পরিবারকে নিয়ে আমাদের ভোট না দিলে এত বড় জয় সম্ভব হত না।”
হুমায়ুনের ‘বাবরি তাস’ ফেল-
গত বিধানসভায় রেজিনগর থেকে জিতেছিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীর। তখন বাবরি মসজিদ তৈরির প্রতিশ্রুতি ছিল তাঁর ট্রাম্প কার্ড। এবার ছেলে গোলাম নবি আজাদকে প্রার্থী করলেও সেই তাস কাজ করেনি। প্রচারে সেভাবে দেখা যায়নি গোলামকে, পুরোটাই সামলেছেন হুমায়ুন। কিন্তু দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারিতে প্রচার ধাক্কা খায় এবং শেষের দিকে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। ভোটের পর কান্নায় ভেঙে পড়ে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে হুমায়ুন বলেন, “শুভেন্দু কথা দিয়ে কথা রাখেননি। নবান্নে ডেকে বলেছিলেন রেজিনগর থেকে গোলামই জিতবে।” যদিও এই দাবি নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি শুভেন্দু। তিনি বলেন, “যাঁরা বলতেন বিজেপি এলে মুসলিমদের বাংলাদেশে পাঠাবে, ধর্ম পালনে বাধা দেবে, গত পাঁচ মাসে তাঁদের সব মিথ্যাচার প্রমাণিত হয়েছে। তাই মানুষ মূলস্রোতে ফিরে সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চাইছে।”
বিরোধীদের আক্রমণ-
ফল নিয়ে সরব বিরোধীরা। মমতা তৃণমূলের বিধায়ক আলিফা আহমেদ বলেন, “রেজিনগরে নির্বাচনের নামে বিজেপি ভোট-ভোট খেলা করেছে। সব সম্প্রদায়ের মানুষ এই প্রহসন দেখেছে।”
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের মতে, “নির্বাচনের নামে যা হয়েছে তা ভোটলুট ছাড়া কিছু নয়।” প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, “সংখ্যালঘুদের ভোট ওরা পায়নি, ওরা ভোট দিয়ে দিয়েছে। এটা জনমতের প্রতিফলন নয়।”
তবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডেমোক্রেটিক তৃণমূলের সুর কিছুটা আলাদা। দলের মুখপাত্র প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “দুটি আসনেই বিজেপি জয়ী হয়েছে, তাই সব মানুষের ভোট পেয়েই জিতেছে। আমরা গণতন্ত্রের শিষ্টাচার মেনে তাঁদের অভিনন্দন জানাই।”