তাপস মহাপাত্র
৯৩ বছর ধরে বাঙালির পুজোর কুসুম ফোটে মহালয়ায়। মহালয়ার কথা উঠলেই কানে বাজে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠস্বর। নিনাদ কন্ঠে চণ্ডীপাঠ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শারদীয়ার অনিবার্য প্রতিরূপ হয়ে গেছেন তিনি। মহালয়া, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র আর শারদীয়ার সংমিশ্রণে বাঙালিরা গড়ে নিয়েছে শরৎ প্রকৃতির পরিপূর্ণতা।
কাশফুলে ভরা মাঠ, ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু, নীল আকাশে শিমুলতুলোর মতো মেঘেরাশি, ভোরে শীতশীতে হাওয়া, ফি বছর এভাবেই সাজগোজ করে আসে শরৎ। তাকে অকাল বোধন দিয়ে উৎসবের ঋতুতে গড়েছেন কৃত্তিবাস ওঝা। তার শুরুটাই মহালয়া। পিতৃ তর্পণের মধ্য দিয়ে দেবী পক্ষের আগমন। এই দিনটি তাই প্রতি বছর বাঙালির কাছে বহু প্রত্যাশার। রেডিওয় মহিষাসুরমর্দিনী শেষ হতে না হতেই গঙ্গার ঘাটে ঘাটে ভরে ওঠে পিতৃ তর্পণের মন্ত্র।
শারদীয়ার এই সূচনা কালের কথা বলতে গেলে ফিরে যেতে হয় ১৯৩০ সালে। জলালাবাদের পাহাড়ে মাস্টারদা সূর্য সেনের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামে লড়তে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন পিতা বিধুভূষণ ভট্টাচার্য। মাথার উপর পরিবারের চাপ। রেডিওর একজন কপি রাইটার। বয়স মাত্র ৩০ বছর। আকাশবাণীতে দুর্গাবন্দনা সম্প্রচারের জন্য তাঁর উপর একটি কাহিনি লেখার দায়িত্ব পড়ল। তিনি লিখলেন। নাম দিলেন- ‘বসন্তেশ্বরী’। মার্কণ্ডেয় চণ্ডী থেকে অনুবাদের কালে তাই শাস্ত্রজ্ঞানের সঙ্গে অলৌকিক ভাবে মিশে গেল আবেগ ও হৃদয় নিংড়োনো আকুতি। যা প্রবলভাবে ছুঁয়ে গেল বাঙালির মন-প্রাণ। ৯৫ বছর আগে সেই তরুণ হলেন মহিষাসুরমর্দিনীর কিংবদন্তী রচয়িতা বাণীকুমার, যাঁর কাগজে কলমে নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। বাসন্তী পুজোর ষষ্ঠীতে আকাশবাণী এই কাহিনীর সম্প্রচার শুরু করল। পাঠ করলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। সংগীত সংযোজনায় ছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক।
এর পরের বছরই ওই ‘বসন্তেশ্বরী’ বাসন্তী পুজোর বদলে দুর্গা পুজোর ষষ্ঠীতে আকাশবাণী এর সম্প্রচার শুরু করে। তার পরের বছর আবার দিন পরিবর্তন। ১৯৩২ সাল থেকে ষষ্ঠীর বদলে অনুষ্ঠানটির সম্প্রচার এগিয়ে আনা হয় মহালয়ার ভোরে। এরপর টানা চৌত্রিশ বছর বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠেই সম্প্রচারিত হতে থাকে মহিষাসুরমর্দ্দিনী। ১৯৭৬ সালে অনুষ্ঠানটিতে এক বিশেষ চমক দিতে চেয়েছিল আকাশবাণী। সেবার বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের পরিবর্তে মহানায়ক উত্তম কুমারের কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দ্দিনী সম্প্রচার করা হয়েছিল। ততদিনে বাঙালির মনে গেঁথে গেছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠস্বর। সেখানে উত্তমকুমারের গলা বেমানান হয়ে যায়। এরপর আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ আর পরীক্ষা নিরীক্ষার দিকে এগোয়নি। মহালয়ায় ‘মহিষাসুরমর্দিনী মানেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ এটাই বাঙালির চিরকালীন সিগনেচার হয়ে ওঠে। সেই ট্র্যাডিশান এখনও চলছে। তাঁর অবর্তমানেও তারই কণ্ঠে রেকর্ড করা অনুষ্ঠানটি প্রতিবছর চলে আসছে, যত দিন মহালয়া চলবে ততদিন বেঁচে থাকবেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে মনে করা হয়, মহালয়ার দিন পিতৃপক্ষের অবসান হয়। শুরু হয় দেবীপক্ষের। মহালয়া শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘মহা’ এবং ‘আলয়’ থেকে এসেছে – যার অর্থ ‘মহান আবাস’ বা ‘দেবীর আবাস’। ধর্মপ্রাণ মানুষেরা মনে করেন, এই পুণ্য তিথিতে পিতৃলোক থেকে মৃত পিতৃ পুরুষদের আত্মা নেমে আসে মর্ত্যলোকে। তাই বিভিন্ন জায়গায় এই দিনে অনেকেই নদীর ঘাটের মত পবিত্র স্থানে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় পিণ্ডদান করেন। তারপর স্নান করে শুদ্ধ হয়। যা তর্পণ নামে পরিচিত। তবে এই তর্পণ শুধুমাত্র পিতৃ পুরুষদের জল দিতেই করা হয়, তা নয়। পাশাপাশি তর্পণের মাধ্যমে আহ্বান জানানো হয় দেবী দুর্গাকে। মর্ত্যে আসার আহ্বান। পুরান মতে এই দিনেই দেবীকে মহিষাসুর বধ করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন স্বর্গের দেবতারা। তাই বিশ্বাস করা হয়, অমাবস্যায় করা আচার-অনুষ্ঠান আশীর্বাদ, সুরক্ষা এবং সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। যারা তাদের পূর্বপুরুষের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রাদ্ধ করেননি তাঁরাও এই মহালয়া অমাবস্যায় শ্রাদ্ধ করতে পারেন। পূর্বপুরুষরা তাদের জীবিত বংশধরদের সঙ্গে দেখা করেন, এই প্রচলন চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।
বাঙালিদের কাছে এই মহালয়া হল গভীর ভাবাবেগ ও আধ্যাত্মিক সংযোগের এক বিশ্বাস, ঐতিহ্যের উদযাপন এবং মন্দকে বিনাশ করে ভালোর জয়ের স্মারক। যার জন্য বাংলার ঘরে ঘরে প্রতি বছর মহালয়া সূচনা করে বাঙালির প্রিয় শারদোৎসব।
