ওঙ্কার ডেস্ক : অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের হাতে নিহত শীর্ষ মাওবাদী কমান্ডার মাদভি হিদমা। মঙ্গলবার সকালে অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিশগড় এবং তেলঙ্গানার সংযোগস্থলের গভীর জঙ্গলে নিরাপত্তা বাহিনী ও মাওবাদীদের সংঘর্ষে নিহত হন দীর্ঘদিন ধরে টার্গেটে থাকা ওই মাওবাদী কমান্ডার। পুলিশ ও বনাঞ্চলে সংঘর্ষে নিহত হন। হিদমা ছাড়া এই সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছে আরও পাঁচ মাওবাদী। নিরাপত্তারক্ষীদের প্রত্যাঘাতে অনেকেই আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল হরিশ কুমার গুপ্তা জানিয়েছেন, এটি দেশে মাওবাদবিরোধী অভিযানের একটি “স্মরণীয়” বিজয়।
বছরের পর বছর ধরে, নিরাপত্তা বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে ধরাছোঁওয়ার বাইরে থেকেছেন হিদমা। তাঁকে শনাক্ত করার মতো কোনো ছবিও ছিল না নিরাপত্তা বাহিনী বা গোয়েন্দাদের হাতে। অষ্টপ্রহর মাওবাদীদের একটা নিরাপত্তা বলয় ঘিরে থাকতো তাঁকে। ফলে প্রতিবারই নিরাপত্তা বাহিনীর পরিকল্পনা বা তল্লাশি আগেই উধাও হয়ে যেতেন হিদমা। এই মাওবাদী শিবিরের নেটওয়ার্ক খুবই শক্তিশালী ছিল। তাই বছরের পর বছর ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর ফাঁদ থেকে বারবার বেরিয়ে যেতে পারতেন হিদমা ও তাঁর বাহিনী। কিন্তু এবার আর শেষ রক্ষা হল না। নিরাপত্তা বাহিনীর জালে আটকে পড়লো হিদমা সহ পুরো বাহিনী।
দেবা বা হিদমালু নামেও পরিচিত ছিলেন এই মাদভি হিদমা। ১৯৮১ সালে সুকমার পুভার্তি গ্রামে জন্ম তাঁর। মাওবাদী দলে যোগ দেওয়ার আগে তিনি দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। জানা গেছে, এই গ্রামে মাওবাদীদের একটি পুকুর তৈরি করতে দেখে তিনি বিদ্রোহী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। বস্তার অঞ্চলে তাঁর জন্মভিটে সুকমা্র ছিল একটি অনুন্নত অঞ্চল ছিল। ২০০০ সালের গোড়ার দিকে মাওবাদী আন্দোলনকে সহায়তা করার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।
হিদমার পরামর্শদাতা বলে পরিচিত রমেশ পুদিয়ামি ওরফে বদরান্নার হাত ধরে হিদমার মাওবাদী আন্দোলনে যোগ দেওয়া। হিদমা তাঁকে বলেছিলেন যে তিনি মাওবাদীদের সঙ্গে যোগ দিতে চান। তার উৎসাহ দেখে বদরান্না রাজি হয়েছিলেন। হিদমা তাকে প্লাটুনের দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে দুই বছর ধরে তার জন্য কাজ করেছিলেন। হিদমা পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মির একটি ব্যাটালিয়নের নেতৃত্ব দেন এবং সিপিআই মাওবাদীদের শীর্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা, কেন্দ্রীয় কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হন। তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির বাস্তার অঞ্চলের একমাত্র উপজাতি সদস্য এবং দণ্ডকারণ্য বিশেষ জোনাল কমিটির একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর স্থানীয় শিকড় এবং সংযোগ মাওবাদী কার্যকলাপে তাঁকে সাহায্য করেছিল। কিন্তু হিদমাকে যাঁরা জানেন তাঁরা বলেন যে এই মাওবাদীর দ্রুত উত্থানের পিছনে বড় কারণ ছিল তাঁর শৃঙ্খলা। সুন্দরী নামে এক প্রাক্তন মাওবাদী এবং বর্তমানে বিদ্রোহ-বিরোধী বাহিনী, জেলা রিজার্ভ গার্ডে কর্মরতা জানিয়েছেন, হিদমা প্রতিদিন ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে সংবাদপত্র পড়তেন এবং সর্বশেষ ঘটনাবলী সম্পর্কে অবগত থাকতেন। তিনি একজন আগ্রহী পাঠকও ছিলেন।
জানা গেছে, তিনি তাঁর ব্যাটালিয়নের জন্য নিবিড় শারীরিক প্রশিক্ষণের উপর জোর দিতেন। কেউ কেউ তাঁকে এই ফ্রন্টে “নির্মম” হিসাবে মনে করতেন। হিদমা জানতেন যে নিরাপত্তার লড়াইয়ের সময় শারীরিক সুস্থতা বিদ্রোহীদের সেরা অস্ত্র। তিনি তাঁর ব্যাটালিয়নের সম্মান অর্জন করেছিলেন কারণ তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন। একসময়কার মাওবাদী কমান্ডার সুন্দরী বলেছিলেন, তাঁর কোনও আসক্তি ছিল না তবে তিনি গরুর মাংস, মুরগি এবং চা পছন্দ করতেন। তিনি ডায়াবেটিস রোগী ছিলেন এবং কেবল চাপাতি খেতেন।
হিদমার নেতৃত্বাধীন ব্যাটালিয়নটিকে মাওবাদীদের সবচেয়ে মারাত্মক স্ট্রাইক ইউনিট হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তিনি যে ২৬টি মাওবাদী হামলার হোতা বলে জানা গেছে তার মধ্যে রয়েছে ২০১০ সালের দান্তেওয়াড়া গণহত্যা, যেখানে ৭৬ জন আধাসামরিক কর্মী নিহত হন এবং ২০১৩ সালের ঝিরাম ঘাঁটিতে হামলা, যেখানে ছত্তিশগড়ের শীর্ষ কংগ্রেস নেতাসহ ২৭ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০২১ সালের সুকমা-বিজাপুর হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তিনিই ছিলেন বলে জানা গেছে, যেখানে ২২ জন নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যু হয়।
জঙ্গল যুদ্ধে বিশেষজ্ঞ হিদমা তাঁর চারপাশে অষ্টপ্রহর ৫ কিলোমিটার নিরাপত্তা বলয় বজায় রেখে চলতেন। তাই বারবার তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর ফাঁদ ফসকে বেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন। মাওবাদী থাকাকালীন হিদমার নিরাপত্তা বাহিনীর অংশ ছিলেন সুন্দরী। তিনি জানিয়েছেন, বিদ্রোহী নেতার নিরাপত্তা রাজ্য পুলিশ প্রধানদের তুলনায় আরও বড়। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত কমান্ডোরা থাকতো হিদমার নিরাপত্তা বলয়ে। তিনি গ্রাম পরিদর্শন এড়িয়ে চলতেন এবং এই বসতিগুলিতে তাঁর তথ্যদাতারা তাঁকে নিরাপত্তা বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে আপডেট রাখতেন। তার জন্য ৫০ লক্ষ টাকারও বেশি পুরস্কার ছিল।
এদিন সকালে অন্ধ্রপ্রদেশের আল্লুরি সিতারামরাজু জেলার মারেদুমিল্লি জঙ্গলে অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে অবশেষে এই ভয়ঙ্কর মাওবাদী নিহত হন। তিনি ছাড়াও গুলির লড়াইয়ে আরও পাঁচজন মাওবাদী নিহত হন। এদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী রাজেও ছিলেন। মাওবাদবিরোধী অভিযানের জন্য অন্ধ্রের বিশেষায়িত বাহিনী গ্রেহাউন্ডস এই অভিযান পরিচালনা করেছিল।
এদিন হিদমা হনন মাওবাদবিরোধী প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। রাজ্যের পুলিশ প্রধান হরিশ কুমার গুপ্তা জানিয়েছেন, “এই সংঘর্ষে অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশ সিপিআই (মাওবাদি) এর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শাখার প্রধানকে নিকেশ করতে পেরেছে।” তিনি আরও বলেছেন, “হিদমা তরুণ আদিবাসীদের বিদ্রোহী দলে যোগদানের জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল।” হিদমার এই হত্যাকাণ্ড এমন এক সময়ে মাওবাদীদের জন্য একটি বড় আঘাত যখন তারা নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আত্মসমর্পণের যে হিড়িক উঠেছে তার মধ্যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। এই ঘটনা বিদ্রোহী সংগঠনটিকে আরও দুর্বল করবে এবং এই অঞ্চলগুলিকে লাল সন্ত্রাস থেকে মুক্ত করার সরকারের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করবে।”
