অর্ণব দত্ত
চলতি বছরে গুরুগ্রামে এক গৃহ গৃহপরিচারিকাকে বিস্তার মারধরের ঘটনা ঘটেছে। এনিয়ে ৯০ সেকেন্ডের একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, ওই তরুণী গৃহ রিচারিকাকে চুল টেনে মারধর করা হয়েছে ব্যাপকভাবে। একই ধরনের নির্যাতনের ঘটনা সামনে এসেছে মহারাষ্ট্রের মীরা রোডেও। দুটি ক্ষেত্রেই পুলিশ আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি আদতে প্রদীপের নীচের অন্ধকারের মতো। বহুক্ষেত্রে গৃহ পরিচারক কিংবা পরিচারিকারা অত্যাচারিত হলেও ওঁরা তা সহ্য করছেন। কারণ জীবিকার তাগিদ।
যৌনকর্মীদের কাজের অধিকার স্বীকৃত হলেও গৃহ পরিচারিকাদের মৌলিক অধিকার এদেশে আজও স্বীকৃত নয়। ২০১০ সালে ডোমেস্টিক ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড সোশ্যাল সিকিওরিটি অ্যাক্ট চালু করা নিয়ে ইউপিএ টু সরকার ভাবনাচিন্তা শুরু করেছিল। এমনকি সেসময় সংসদে খসড়াও তৈরি হয়। এরপর ২০১৪ সালে কেন্দ্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিববর্তন হলেও গৃহ পরিচারক কিংবা পরিচালকদের ন্যূনতম মজুরি-সহ অন্যান্য অধিকারের লড়াই আজও চলমান।
সারা দেশে লক্ষ লক্ষ গৃহ পরিচারিকা এবং পরিচারকরা ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা-সহ নানা দাবিতে গত কয়েক দশক ধরে অনবরত লড়ছেন। অন্তত ১০টি ইউনিয়ন দাবি আদায়ে বর্তমানে ময়দানে সামিল। চলতি বছর মামলা এসম্পর্কে গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্টেও। তবে লাভের লাভ কিছুই হয়নি।
ভারতে গৃহ পরিচারিকা ও পরিচারকদের সঙ্গত দাবি নিয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত হয় সেই ১৯৮৫ সালে। মুম্বই এবং চেন্নাইতে আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিল “দি ন্যাশনাল ডোমেস্টিক ওয়াকার্স মুভমেন্ট” নামে একটি সংগঠন। এরপর আরও একাধিক সংগঠন গঠিত হয়। সবমিলিয়ে অন্তত ৯টি। এদেশে গৃহ পরিচালিকাদের মধ্যে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বয়স ১৮ বছরের উপর কিংবা ওরা দরিদ্র পরিবারের সদস্য নাবালিকা। মূলত দলিত, আদিবাসী এবং পরিযায়ী মহিলার পাশাপাশি নাবালিকারাও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। কোনও কোনও ক্ষেত্রে টানা ১৮ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। এখবর সাম্প্রতিক সমীক্ষায় প্রকাশিত।
১৯৮৫ সালে গৃহ পরিচারিকা এবং পরিচারকদের আন্দোলনের সূত্রপাত করেন বিদেশে ডিগ্রিধারী এক মহিলা। ওঁর নাম ড. জেনি ডেভোস। ২০০৫ সালে তাঁর নাম শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্যে মনোনীত হয়েছিল। তিনি নোবেল না পেলেও একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
সূত্র্রের খবর, বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য, যেমন কেরল, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, ঝাড়খণ্ড গৃহ পরিচালক এবং পরিচালকদের জন্যে কল্যাণমূলক উদ্যোগে বোর্ড গঠন করেছে। গৃহ পরিচারক কিংবা পরিচারিকা হিসেবে যারা কাজ করেন, ওরা এদেশের অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক হিসেবে অন্তর্গত। ইউপিএ টু আমলে চালু হয়েছিল ২০০৮ সালে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্যে সোশ্যাল সিকিওরিটি অ্যাক্ট। ২০০৭ সালে বাংলায় বাম আমলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে সামাজিক সুরক্ষা আইন চালু করে তাতে গৃহ পরিচারিকা এবং পরিচারিকাদের অন্তর্গত করা হয়। একাধিক বেসরকারি সংস্থার সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ভারতে ১ কোটি ৩০ লক্ষ গৃহ পরিচারিকার বয়স ১৮ বছরের চেয়ে কম। পরিসংখ্যানের নিরিখে এই হার মোট গৃহ পরিচারিকার সংখ্যার ৮৬ শতাংশ।
উল্লেখ করার মতো বিষয় যে, বাংলায় সদ্য গঠিত বিজেপি সরকারের অন্যতম প্রতিমন্ত্রী কলিতা মাঝিও একদা ছিলেন একজন গৃহ পরিচারিকা। মাসিক রোজগার ছিল মোটে ৪ হাজার টাকা।
২০১৪ সাল থেকে কলিতা বিজেপি হয়ে রাজনীতি করেছেন। অবশেষে ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার অবসানের পরে রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে কেবল নজিরই তৈরি করেননি, বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রেরণা জুগিয়েছেন কলিতা।
২০১০ ইউপিএ টু জমানায় সালে গৃহ পরিচারক, পরিচারিকাদের দাবিদাওয়া নিয়ে সংসদে আইন প্রণয়নের যে খসড়া তৈরি হয়েছিল তা আজও ঠাণ্ডাঘরে। এদিকে গৃহ পরিচারক কিংবা গৃহ পরিচারিকারা সারা দেশে শারীরিক, আবেগজনিত এবং যৌন নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন স্বাধীনতার ৮০ বয়স পেরিয়েও।
সূত্র্রের খবর, গৃহ পরিচারিকা কিংবা পরিচারকরা এদেশের অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত অন্যতম বিপুল সংখ্যক কর্মী। তবে ঠিক কত সংখ্যক নারী বা পুরুষ একাজের সঙ্গে যুক্ত তা নিয়ে যথাযথ তথ্য নেই। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির হিসেবে, এই সংখ্যাটা অন্তত ৫০ লক্ষ থেকে ৫ কোটি। এঁদের একাংশ পূর্ণ সময় কিংবা আংশিক সময়ের কর্মী। ১৯৮৫ সাল থেকে গৃহ পরিচালক কিংবা পরিচারিকাদের কাজের আইনিসঙ্গত অধিকারগুলি নিয়ে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আন্দোলন ও দাবিদাওয়া তুললেও চিঁড়ে ভেজেনি আজও। ব্যাপারটা দুভার্গ্যজনকই।