বাস, গাড়ি, ট্রেন, জাহাজ কিংবা বিমানে যাতায়াতের সময় অনেকেরই বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, অস্বস্তি বা অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার মতো সমস্যা দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় ‘মোশন সিকনেস’ (Motion Sickness)। এটি সাধারণত গুরুতর কোনো রোগ নয়, তবে ভ্রমণের আনন্দ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এই সমস্যা দেখা যায়।
মোশন সিকনেস কী?
মোশন সিকনেস হলো চলাচলজনিত এক ধরনের শারীরিক অস্বস্তি। আমাদের চোখ, অন্তঃকর্ণের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণকারী অংশ এবং শরীরের পেশি ও স্নায়ু মস্তিষ্ককে চলাচল সম্পর্কে বিভিন্ন সংকেত পাঠায়। যখন এই সংকেতগুলির মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়, তখন মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এর ফলেই মোশন সিকনেসের উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন, চলন্ত গাড়িতে বসে বই পড়ার সময় চোখ স্থির অবস্থার সংকেত দিলেও অন্তঃকর্ণ গাড়ির চলাচলের সংকেত পাঠায়। এই পার্থক্যই বমি বমি ভাব বা মাথা ঘোরার কারণ হতে পারে।
মোশন সিকনেসের প্রধান লক্ষণ:
এই সমস্যার লক্ষণ ব্যক্তি বিশেষে আলাদা হতে পারে। তবে সাধারণত লক্ষণগুলি হলো—
বমি বমি ভাব এবং বারবার বমি হওয়া।
মাথা ঘোরা ও মাথা ভার লাগা।
অতিরিক্ত ঘাম হওয়া।
মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।
মাথাব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতা।
মুখে অতিরিক্ত লালা জমা।
ক্লান্তি, অস্বস্তি ও অস্থিরতা অনুভব করা।
কখনো কখনো ঘুম ঘুম ভাব দেখা দেওয়া।
কেন হয় মোশন সিকনেস?
মোশন সিকনেসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো চোখ ও অন্তঃকর্ণের মধ্যে চলাচল সংক্রান্ত সংকেতের অসামঞ্জস্য। এছাড়া পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানো, সমুদ্রের ঢেউয়ের মধ্যে জাহাজে ভ্রমণ, বিমানের ঝাঁকুনি, চলন্ত গাড়িতে মোবাইল ব্যবহার বা বই পড়া এই সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। যাঁদের মাইগ্রেনের প্রবণতা রয়েছে, তাঁরাও তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রান্ত হতে পারেন।
মোশন সিকনেস থেকে উপশমের উপায়:
কিছু সহজ সতর্কতা অবলম্বন করলে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সামনের দিকে তাকান: গাড়িতে বসে দূরের স্থির কোনো বস্তু বা দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকুন। এতে চোখ ও অন্তঃকর্ণের সংকেতের অসামঞ্জস্য কমতে পারে।
মোবাইল ব্যবহার এড়িয়ে চলুন: ভ্রমণের সময় বই পড়া, মোবাইল দেখা বা ভিডিও গেম খেলা থেকে বিরত থাকুন।
হালকা খাবার খান: ভ্রমণের আগে অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার না খেয়ে হালকা খাবার গ্রহণ করুন।
পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন: গাড়ির জানালা খুলে বা এসির মাধ্যমে পর্যাপ্ত বাতাসের ব্যবস্থা করুন।
আদা খেতে পারেন: আদা কারও কারও বমি বমি ভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন: ভ্রমণের আগে ভালোভাবে ঘুমিয়ে নিন এবং শরীরকে ক্লান্ত হতে দেবেন না।
সঠিক আসন নির্বাচন করুন: গাড়ির সামনের আসন, বিমানের ডানার কাছাকাছি আসন কিংবা জাহাজের মাঝামাঝি অংশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হতে পারে।
চিকিৎসা ও ওষুধ:
মোশন সিকনেসের সমস্যা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ডাইমেনহাইড্রিনেট বা সিনারিজিনের মতো ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে স্কোপোলামিনও ব্যবহৃত হয়। তবে এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘুম ঘুম ভাব, মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা ঝিমুনি দেখা দিতে পারে। তাই নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।