ওঙ্কার ডেস্কঃ আইপ্যাককান্ডে জল গড়িয়েছে হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিমকোর্টে। বৃহস্পতিবার সুপ্রিমকোর্টে ইডির মামলার শুনানি হয়। বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র ও বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির ডিভিশন বেঞ্চে মামলার শুনানি হয়। ইডির তরফে আদালতে সওয়াল করেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনি অভিযোগ করেন, মুখ্যমন্ত্রী নিজে তদন্তে বাধা দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীকে সহায়তা করেছেন ডিজিপি, পুলিশ কমিশনার ও কলকাতা পুলিশের ডিসি-সাউথ। ডিজিপি রাজীব কুমার, কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা ও ডিসি সাউথ প্রিয়ব্রত রায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানিয়েছে ইডি।
কপিল সিব্বলের সওয়াল, আইপ্যাক-এর কাছে রাজনৈতিক দলের বিপুল পরিমাণ তথ্য থাকে। যখন ইডি সেখানে গিয়েছিল, তখন তারা জানত যে দলের বহু গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল তথ্য সেখানে থাকবে। নির্বাচনের ঠিক মাঝখানে সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন কী ছিল? ইডি দাবি করেছে, কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তারা নেয়নি। আই-প্যাক অফিসে তল্লাশির সময়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সব ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে গিয়েছেন। —এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর।
শুনানিতে বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র ইডির দাবির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “আপনাদের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। যদি সত্যিই নথি সংগ্রহের উদ্দেশ্য থাকত, তা হলে তো কিছু জিনিস বাজেয়াপ্ত হত। কিন্তু এখানে তো কিছুই বাজেয়াপ্ত হয়নি।”
সুপ্রিমকোর্টে ইডির তরফে দাবি করা হয়েছে যে, আগে থেকে ইমেল করেই তল্লাশি করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও মুখ্যমন্ত্রী পুলিশ নিয়ে গিয়ে তল্লাশিতে বাধা দিয়েছেন। আইনজীবী সিঙ্ঘভির সওয়াল, “তল্লাশি শুরু হয়েছিল ভোর ৬টা ৪৫ মিনিটে। আর ইমেল পাঠানো হয়েছিল তার অনেক পরে, সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে। ওই ইমেল পাঠানোটা ছিল আসলে পরে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা।” রাজ্য এবং ডিজিপির হয়ে সিঙ্ঘভি আরও বলেন, “কিছু অচেনা লোক ওই জায়গায় ঢুকেছে এই খবর শুনে সেখানে গিয়েছিলেন ডিজিপি। মুখ্যমন্ত্রী জেড প্লাস নিরাপত্তা প্রাপ্ত। এই ধরনের তথ্য পেলে ডিজিপির সেখানে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।”
কপিল সিবাল আদালতের সামনে ইডির নিজস্ব পঞ্চনামা তুলে ধরে জানান, সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে—আই-প্যাক অফিস বা প্রতীক জৈনের ফ্ল্যাটে কোনও অনিয়ম বা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি। তাঁর বক্তব্য, “এই পঞ্চনামায় ইডির অফিসারদেরই সই রয়েছে। অথচ পিটিশনে উল্টো কথা বলা হয়েছে। পিটিশনের বক্তব্য পঞ্চনামার উল্টো।”
এই ঘটনায় সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছে ইডি। ইডির হয়ে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল রাজুর সওয়াল, “এই মামলা একেবারেই ব্যতিক্রমী। কারণ, এখানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজেই অভিযুক্ত। চুরির কাজটি মুখ্যমন্ত্রীই করেছেন। আর এই ঘটনা ঘটেছে পুলিশ কমিশনার ও রাজ্য পুলিশের ডিজিপির উপস্থিতিতে। অর্থাৎ, পুলিশের শীর্ষ কর্তারা এই ঘটনায় জড়িত। এই মামলায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।” পাশাপাশি ইডির আধিকারিকদের জন্য সুপ্রিমকোর্টের থেকে রক্ষাকবচ চেয়েছেন তিনি।
আইপ্যাক-কাণ্ডে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, অত্যন্ত গুরুতর একটি প্রশ্ন উঠে আসছে। ইডি বা অন্য কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্তে রাজ্য সরকারের সংস্থাগুলি হস্তক্ষেপ করতে পারে কি না! এই বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের খতিয়ে দেখা জরুরি বলেই প্রাথমিক মত দুই বিচারপতির বেঞ্চের। মামলার সঙ্গে জড়িত সব পক্ষকে নোটিস জারি করল সুপ্রিম কোর্ট। ইডির বিরুদ্ধে পুলিশের দায়ের করা এফআইআরের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করল সুপ্রিম কোর্ট। পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত পুলিশি তদন্তের উপরেও স্থগিতাদেশ দেয় আদালত। মামলায় সব পক্ষকে নোটিস জারি করেছে দুই বিচারপতির বেঞ্চ।
পাশাপাশি শীর্ষ আদালতের দুই বিচারপতির বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থারই কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কাজে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। তবে যদি কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থা সৎ উদ্দেশ্যে কোনও গুরুতর অপরাধের তদন্ত করে, তা হলে কি শুধুমাত্র এটা ‘দলের কাজ’— এই অজুহাতে তাদের তদন্ত চালানোর ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা যেতে পারে?”
সব মিলিয়ে, আই-প্যাক তল্লাশি ঘিরে ইডির অভিযোগ বনাম পঞ্চনামার নথিভুক্ত তথ্য, রাজ্যের অভিযোগ, এই দ্বন্দ্বই এখন সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি ফের এই মামলার শুনানি হবে।
