তাপস মহাপাত্র
এই মাসের মাঝামাঝি কর্ণাটকে কুর্শি নিয়ে যে দড়ি টানাটানি শুরু হয়েছিল ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের মধ্যে, হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপে অবশেষে অন্তত তার সাময়িক নিস্পত্তি হল। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া ও তাঁর ডেপুটি ডিকে শিবকুমারের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত পুরোনো শর্ত ঘিরে। সরকার ঘটনের প্রথমে কর্নাটক কংগ্রেসের মধ্যে সিদ্দারামাইয়া ও শিবকুমার- এই দুই যুযুধান শিবিরকে শান্ত করতে একটি চুক্তি করেছিল কংগ্রেস হাইকমান্ড। রণদীপ সিং সুরজিওয়ালার মধ্যস্থতায় প্রথম আড়াই বছর কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী হন আদিবাসীদের প্রভাবশালী নেতা সিদ্দারামাইয়া। শর্ত অনুযায়ী শেষ আড়াই বছর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হবেন ভোক্কালিগা সম্প্রদায়ের মুখ ডিকে শিবকুমার। সেই অনুযায়ী এই নভেম্বরেই সিদ্দারামাইয়ার মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু তার আগেই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জেদ ধরেন তিনি পূর্ণ মেয়াদ মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। এখানেই বিরোধ শুরু দুই কংগ্রেস নেতার মধ্যে। পরিস্থিতি এমন পর্যায় পৌঁছোয় যে কর্নাটকেও কংগ্রেস ক্ষমতা হারাচ্ছে এমন একটা জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক মহলে। কংগ্রেস কোন্দলে হিসেব করা শুরু করে বিজেপিও। শিবকুমারও সদলবলে দিল্লিতে দরবার করেন। এদিকে গোঁ ধরে থাকেন সিদ্দারামাইয়া।
শুক্রবার সন্ধ্যায় এই বিরোধ আরও তীব্র আকার নেয়। এদিন বেঙ্গালুরুতে একটি সরকারি অনুষ্ঠানে শিবকুমার দলের প্রাক্তন চেয়ারপার্সনের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে সিদ্দারামাইয়ার বিরুদ্ধে এক হাত নেন। তিনি বলেন, “২০০৪ সালে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স লোকসভা নির্বাচনে জয়লাভের পর দল ও জোটের তরফে প্রবল অনুরোধ সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি সোনিয়া গান্ধী। তিনি ২০ বছর ধরে কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। তিনি ক্ষমতাও ত্যাগ করেছিলেন…তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল কালাম তাঁকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য ডেকেছিলেন কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং পরিবর্তে মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।”
এই বক্তব্য যে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার উদ্দেশ্যে তা বলাই বাহুল্য। শিবকুমার ও তাঁর সমর্থকরা যে বিদ্রোহের দিকে যাচ্ছে তা আঁচ করতে পেরে টনক নড়ে হাইকমান্ডের। পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক অবস্থায় যাচ্ছে বুঝতে পেরে দিল্লি থেকে সিদ্দারামাইয়ার কাছে অবিলম্বে সমস্যা মিটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ আসে। কংগ্রেস হাইকমান্ডের নির্দেশ মেনে শুক্রবার কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া প্রাতরাশ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন উপমুখ্যমন্ত্রী তথা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ডিকে শিবকুমারকে। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে শনিবার সকালে সিদ্দারামাইয়ার সরকারি বাসভবন ‘কাবেরী’তে হাজির হন শিবকুমার। সেখানে সাংবাদিকদের তিনি বললেন, ‘‘আমি খুশি। দলে কোনও সঙ্কট নেই। কংগ্রেস হাইকমান্ড সমস্যার সমাধান করে দেবে।’’ তিনি আরও বলেন, “আমরা বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করতে বসেছিলাম। আমাদের লক্ষ্য কর্পোরেশন, গ্রাম পঞ্চায়েত এবং ২০২৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করা।”
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়ার আগে কর্নাটকের দুই নেতার ব্রেকফাস্টের ছবি নেন ফটোগ্রাফাররা। ইডিলি, দোসা এবং কেশরী স্নান পরিবেশিত খাবার টেবিলে দুই নেতার ছবি যেন রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যে অলৌকিক বার্তা হয়ে ওঠে। তবে উভয়ের বক্তব্যে বারবার হাইকমান্ড কথা শোনা যায়। যেখান থেকে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না, তাঁদের রাজনৈতিক ভাগ্য তাঁরা ছেড়ে দিয়েছেন দলের দিল্লি নেতৃত্বের হাতে। আপাতত দুই নেতা ২০২৮ সালের নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়ার জন্য এই দক্ষিনী রাজ্যে ঐক্যবদ্ধ কংগ্রেস দেখাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। শিবকুমার বলেন, “আমরা দুজনেই বিধানসভা নির্বাচনে কাজ করেছি। একইভাবে, আমরা ২০২৮ সালের নির্বাচন একসঙ্গে লড়তে চাই। আমাদের কোনও মতপার্থক্য নেই। আজ পর্যন্ত কোনও মতপার্থক্য ছিল না এবং ভবিষ্যতেও কোনও মতপার্থক্য থাকবে না,” তবে ভেতরকার খবর, এদিন ব্রেকফাস্ট রাজনীতিতে যা ইংগিত মিলেছে তাতে শিবকুমারের পক্ষে একটি স্পষ্ট উত্তরণ ঘটতে চলেছে বলে মনে হচ্ছে।
যদিও ব্রেকফাস্ট বৈঠকে দুই নেতা্র মধ্যে কী সমঝোতা হল সে বিষয়ে বিশদ জানা যায়নি। তাঁদের আলাপচারিতায় ফের কোনো শর্ত বা চুক্তি জায়গা নিল কিনা তাও এই মুহূর্তে বলয়া সম্ভব নয়, তবে এটা ঠিক ব্রেকফাস্ট থেকে উঠে এসে সাংবাদিকদের কাছে যে সব কথাবার্তা তাঁরা তুলে ধরেছেন তাতে সুনির্দিষ্ট কোনো ভবিষ্যতের আঁচ মেলেনি। উভয়ের বক্তব্যে তথাকথিত রাজনৈতিক সিস্টাচার দেখা গেছে মাত্র। জানা গেছে, সিদ্দারামাইয়ার ডেপুটি থাকবেন শিবকুমার, রাজ্যে কংগ্রেস জনসমক্ষে কোনও বিরোধিতা দেখতে চায় না এবং সিদ্দারামাইয়ার মতো দীর্ঘদিনের কংগ্রেস নেতাকে হঠাৎ করে ক্ষমতা থেকে সরানো হলে দলের ক্ষতি হবে।

সূত্র জানিয়েছে সম্ভবত শিবকুমারের প্রস্তাবিত মন্ত্রিসভা ও অন্যান্য পরিবর্তনে সম্মত হয়েছে সিদ্দারামাইয়া। যাতে রদবদলের ফলে তাঁর অনুগতরা আরও বেশি জায়গা পেতে পারেন পরিবর্তিত মন্ত্রিসভায়। এমনিতে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিকূল পদক্ষেপ নেওয়ার মতো বিধায়ক সংখ্যা নেই শিবকুমারের। তাই যে কোনও পরিস্থিতিতে শিবকুমারের পক্ষে এটিই সেরা চুক্তি বলে মনে হচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যায় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে দিল্লি যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতিগত হিসাব বিবেচনা করে সিদ্দারামাইয়াকে সরানো সহজ ছিল না। তাঁকে ‘অহিন্দা’ রাজনৈতিক জোটের সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ হিসেবে দেখা হয়। যা নিঃসন্দেহে ভোক্কালিগাদের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে। শিবকুমার হলেন ওবিসি ভোক্কালিগা সম্প্রদায়ের মুখ। যদিও কংগ্রেস এই গোষ্ঠীকেও এড়িয়ে চলতে পারে না। আপাতত দুর্যোগ কাটলেও, আকাশ কতদিন পরিষ্কার থাকে এখন সেটাই দেখার।
