তাপস মহাপাত্র
ভারতে বাম রাজনীতির চরম নিস্প্রভতার মধ্যে এখন অতি উজ্জ্বল নাম নেহা বোরা। আইসা-র সভানেত্রী তিনি। জাতীয় রাজনীতিতে যিনি এই মুহূর্তে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় নেত্রী। মূলত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা নজর কাড়লেও, সম্প্রতি জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর উপস্থিতি উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। হয়তো তার অন্যতম কারণ বর্তমানে আন্দোলনমুখী তরুণ সমাজে নেহার গ্রহণযোগ্যতা। ইতিমধ্যে তিনি রপ্ত করেছেন রাজনীতিতে জায়গা করে নেওয়ার অপরিহার্য কিছু গুণ। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রার স্নেহ ও সুনজরে এসে যাওয়ার সম্ভবত এটাই কারণ। বিরোধী শিবিরের যৌথ সম্মেলনে বা সাংবাদিক বৈঠকে যে ভাবে রাহুল প্রিয়াঙ্কা তাঁকে বক্তব্য রাখার জন্য এগিয়ে দিচ্ছেন তাতে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না নেহা বোরা ইতিমধ্যে জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছেন।
নেহার অনেক আগে ভারতে বাম আন্দোলন যখন জাতীয় রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন বৃন্দা কারাত, সুশীলা গোপালন, কে. আর. গৌরী আম্মা, ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সায়গল, ইউ. বাসুকি, কে. কে. শৈলজা, রেণু চক্রবর্তী, অরুণা আসফ আলী, কবিতা কৃষ্ণনের মত একঝাঁক মহিলা নেত্রী। যাঁরা একসময় পূর্ণ উদ্যোমে বিরাজ করতেন। কিন্তু তাঁদের পর অন্তত দু যুগ ধরে বাম আন্দোলনের ধারা ক্রমেই তলানিগামী। ২০০৪ সাল থেকে ২০২৪-এর সাধারণ নির্বাচনের গতিমুখ দেখলে বাম আন্দোলনের নিম্নমুখিতা লক্ষ্য করা যায়। ভাটা পড়ে তাদের নারীবাদী আন্দোলনেও।
২০০৪ সালে সিপিআই (এম), সিপিআই, আরএসপি এবং অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক—এই দলগুলো যৌথভাবে ৫৯টি লোকসভা আসনে জয়লাভ করেছিল। তাদের সম্মিলিত আসন সংখ্যা ২০০৯ সালে কমে ২৪-এ, ২০১৪ সালে ১১-তে এবং ২০১৯ সালে ৬-এ নেমে আসে। তবে ২০২৪ সালে তা কিছুটা বেড়ে ৯-এ পৌঁছায়। ২০০৪ সালে ৪৩টি আসনে জয়ী সিপিআই(এম)-এর আসন সংখ্যা ২০২৪ সালে কমে ৪টিতে দাঁড়ায়। তাদের প্রাপ্ত ভোটের হারও ৫.৬৬ শতাংশ থেকে কমে ১.৭৮ শতাংশে নেমে আসে। ২০০৪ সালে সিপিআই জিতেছিল ১০টি আসনে। ভোট পেয়েছিল ১.৪১ শতাংশ। ২০২৪ সালে তাদের আসন কমে দাঁড়ায় ২টিতে। ভোটের হার ০.৪৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সিপিআই (এমএল) লিবারেশন ২টি আসনে জয়ী হয় এবং আরএসপি জেতে ১টি আসনে।
ফলে জাতীয় রাজনীতিতে কার্যত সাইনবোর্ডে পরিণত হওয়া বামপন্থীদের কাছে এই মুহূর্তে নেহা বোরা কার্যত এক উজ্জ্বল আশা। তরুণদের কাছে ক্ষোভের প্রতীক, কংগ্রেসের কাছেও নতুন প্রিয় মুখ। কথা হল- ভারতে বামপন্থী আন্দোলনের এই গোধূলি লগ্নে কী ভাবে আলোকময় হয়ে উঠলেন নেহা। এর পিছনে তার্পর্যই বা কী।
নেহা বোরা সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন ‘আইসা’-র নেতৃত্ব দেন। বামপন্থীরা যখন বৃহত্তর নির্বাচনী ভিত্তি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, তখনও বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে এই সংগঠনটি নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছে। ছাত্র-যুব আন্দোলনের হাত ধরে ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভানেত্রী নেহা বোরা জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। ১২ অক্টোবর, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে পিটিশন দাখিল করতে ‘ইন্ডিয়া’ জোট যখন সুপ্রিম কোর্টের চলো মিছিলে, তখন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে দেখা যায় নেহা বোরাকে ক্যামেরা ও বিক্ষোভকারীদের ভিড় থেকে আগলে রাখতে। এই মুহূর্তটি বুঝিয়ে দেয়, ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে এই ছাত্রনেত্রীর পরিচিতি কতটা বিস্তৃত হয়েছে। বামপন্থীদের নির্বাচনী ভিত্তি যখন প্রায় তলানিতে তখন ক্যাম্পাস রাজনীতিতে বুক চিতিয়ে সোচ্চার তাদের ছাত্র সংগঠনগুলো। তাই নেহা বোরার এই উত্থান দেশের বামপন্থীদের কাছে আশার আলো জ্বালিয়েছে।
‘ইন্ডিয়া’ জোট বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার অনেক আগে থেকেই বামপন্থীরা ও তাদের ছাত্র সংগঠনগুলো গ্রাউন্ড জিরো আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এমনকি তারা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র মতো গোষ্ঠীগুলোকেও সমর্থন জুগিয়েছে। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের এক সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল গান্ধীকে দেখা যায়, অন্যান্য প্রবীণ নেতাদের আগেই নেহা বোরাকে কথা বলার জন্য উৎসাহিত করছেন। কংগ্রেস নেতারাও যে তাঁর এই উত্থানকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন, তা স্পষ্ট।
নেহা বোরা হলেন আইসা-র সভানেত্রী, যা কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) লিবারেশন-এর ছাত্র সংগঠন। বামপন্থীরা যখন তাদের বৃহত্তর নির্বাচনী ভিত্তি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, তখনও এআইএসএ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে, বিশেষ করে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ), নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে জেএনইউ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে, আইসা, সিপিআই(এম)-এর ছাত্র সংগঠন এসএফআই এবং ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস ফেডারেশন-এর একটি জোট কেন্দ্রীয় প্যানেলের চারটি পদেই জয়লাভ করে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে আম্বেদকর ইউনিভার্সিটি দিল্লিতে, ৪৫টি ছাত্র সংসদ আসনের মধ্যে এসএফআই ২৪টিতে জয়ী হয় এবং এআইএসএ ছয়টি আসন লাভ করে। হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে একটি বৃহত্তর বাম-আম্বেদকরবাদী জোট কেন্দ্রীয় প্যানেলে জয়ী হয়। যেখানে আইসা যুগ্ম সম্পাদক পদ এবং দুটি কাউন্সিলর আসন অর্জন করে। নেহার প্রাথমিক সাফল্য এখানেই। এরমধ্যে ছাত্র-যুব আন্দোলন ঘনীভূত হওয়ায় নেহাও সামনের সারিতে এসে যান। প্রথমে শিক্ষা দুর্নীতি নিয়ে ককরোচদের আন্দোলন, সেই মঞ্চে নেহার সক্রিয়তা। পরবর্তী কানে জ্ঞানেশ ইস্যুতে তাঁর আরও অভিজ্ঞ যোগদান এই অল্প বয়সেই নেহাকে জাতীয় রাজনীতির ফ্ল্যাশ লাইটে উজ্জ্বল করে তুলেছে।