তাপস মহাপাত্র
কেরালা ক্যাডারের ১৯৮৮ ব্যাচের আইএএস জ্ঞানেশ কুমার গুপ্তা ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ ভারতের ২৬তম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার ‘চিফ ইলেকশন কমিশনার অ্যান্ড আদার ইলেকশন কমিশনারস অ্যাক্ট, ২০২৩’-এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের প্রক্রিয়া পরিবর্তনের পর তিনিই ছিলেন প্রথম নিযুক্ত সিইসি। দুই দশকেরও বেশি সময় পর দেশে ভোটার তালিকা সংশোধনের যে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ সংক্ষেপে SIR প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করা হয়েছিল, তা এই মুহূর্তে জ্ঞানেশ কুমার-নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এর ফলে সারা দেশে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১২ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে বলে জানা গেছে।
এর প্রভাব পড়েছে এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে। যেমন, মহারাষ্ট্রে নতুন নাম যুক্ত হওয়া কিংবা বাংলায় মোট ৯২ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়া। বুধবার ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য—সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশি—অন্তত ১৪ বার এমন সব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অফিসিয়ালি আপত্তি জানিয়েছিলেন। অথচ তা অমান্য করে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার, যদিও সেই সব সিদ্ধান্ত দেখানো হয়েছে তিন সদস্যের কমিশনের নামে।
পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগেই, ২০২৯ সালের ২৬ জানুয়ারি কুমারের মেয়াদ শেষ হবে। তার আগে ওই প্রতিবেদনে এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে যা জ্ঞানেশকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ১৪ মার্চ নতুন আইনের অধীনে কুমার ও সান্ধু—উভয়কেই নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগের বিষয়ে তৎকালীন লোকসভায় বিরোধী দলনেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী এই দুই নতুন নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে একটি নোট জমা দিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের জন্য গঠিত তিন সদস্যের কমিটি থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অন্য এক সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করার যে আইনটি আনা হয়েছিল, তা সুপ্রিম কোর্টেও চ্যালেঞ্জ করা হয়। ওই আইনকে চ্যালেঞ্জ করার বিষয়টি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো উচিত কি না, সে বিষয়ে বুধবার সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ আলাদা রায় দিয়েছে।
লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সর্বপ্রথম ১ আগস্ট ২০২৫-এ “ভোট চুরি”-র অভিযোগ তোলেন। এর ছয় দিন পর তিনি একটি বিস্তারিত সাংবাদিক সম্মেলন করেন, যেখানে বেঙ্গালুরু সেন্ট্রাল লোকসভা আসনের অন্তর্গত মহাদেবপুরা বিধানসভা কেন্দ্রের উদাহরণ তুলে ধরেন। রাহুল সেখানে একই ভোটারের একাধিকবার নাম থাকা, ভুল ঠিকানা এবং একই ঠিকানা থেকে বিপুল সংখ্যক ভোটার থাকার বিষয়গুলো উল্লেখ করেছিলেন। সেসময় জ্ঞানেশ কুমার সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুলের অভিযোগ খারিজ করেছিলেন। এমন কি বিরোধী দলনেতাকে হলফনামা দাখিল অথবা ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। মেশিন-রিডেবল ভোটার তালিকা এবং ভোটকেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ দেখার বিষয়ে বিরোধী জোটের দাবি তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, এতে নারী ভোটারদের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে “লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি” নিয়ে ব্যাপক শোরগোল ওঠে। নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও বিরোধী দলগুলো এসআইআর-এর আওতায় থাকা “লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি” বা যৌক্তিক অসঙ্গতির বিষয়টিকে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। রাজ্যসভার সাংসদ কপিল সিবাল-সহ অনেকেই বলেছিলেন, এই পদ্ধতিটি প্রথমে বাংলায় ব্যবহার করা হয়েছিল, অথচ ২০২৪ সালে মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানায় বিধানসভা নির্বাচনে তা ব্যবহার করা হয়নি। বাংলার নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার প্রায় এক মাস পর, দিল্লিতে আয়োজিত এক সম্মেলনে জ্ঞানেশ কুমার দাবি করেন: “এটি বিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত ও নির্ভুল ভোটার তালিকা। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে প্রতিটি যোগ্য ভোটারের নাম তালিকায় রয়েছে এবং প্রতিটি অযোগ্য ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।”

চলতি বছরের মার্চ মাসে সংসদে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ সামনে আসে। তা হল- সংসদের উভয় কক্ষে লোকসভার ১৩০ জন এবং রাজ্যসভার ৬৩ জন সাংসদ জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ১০ পৃষ্ঠার একটি নোটিশ জমা দেন। যাতে তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তোলা হয়। সেইসঙ্গে পক্ষপাতমূলক আচরণ, এসআইআর-এর মাধ্যমে ব্যাপক হারে ভোটাধিকার হরণ ও তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনে তাঁকে পদ থেকে অপসারণের দাবি জানানো হয়। এর পরের মাসে রাজ্যসভার আরও ৭৩ জন সাংসদ আরেকটি নোটিশ জমা দেয়।বুধবারের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশের পর জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।