অর্ণব দত্ত
কেনাকাটার ক্ষেত্রে পুরনো রীতিনীতির বদল হয়েছে। বাজারে প্রবেশ করেছে অনলাইন। অনলাইনেই মিলে যাচ্ছে পিন টু এলিফ্যান্ট। অর্ডার করলেই হল, নিমেষেই তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে সেলসবয়রা। এই অনলাইনের জমানায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ছোট মাঝারি দোকানিদের ব্যবসা। সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, অনলাইনে্ অর্ডার করলে সহজে সামগ্রী মেলার ফলে দোকানিদের ব্যবসা ৩০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত। বিশেষত ভারতের মেট্রো শহরগুলিতে এই পরিস্থিতি।
স্বামী বিবেকানন্দ একদা মনে করেছিলেন, প্রাচ্য ও সাহেবসুবোদের মেলাবেন। প্রাচ্যর প্রজ্ঞা সাহেবসুবোদের দান করে ওঁদের প্রযুক্তি ভারতে আমদানি করে দেশকে উন্নত করবেন। হয়েছে বরং উল্টো। প্রযুক্তির রমরমা হলেও সাধারণ দেশবাসীর তাতে লাভ হওয়া তো দূরের কথা, উল্টে ক্ষতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কেননা প্রযুক্তি এখন কুক্ষিগত একশ্রেণির মুনাফাখোর বণিক সম্প্রদায়ের হাতে। তাঁরা ফুলেফঁপে উঠছেন। আর সাধারণ নাগরিকদের জীবনে প্রযুক্তি ব্যাপক হারে ব্যবহার করে তাঁদের জীবনকে এমন স্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যা আরাম হারামের সমতুল।
একইসঙ্গে আরেকটি সমস্যা দেখা দিয়েছে যা ধৈর্যহীনতা। অনলাইনে ঘরে বসে অর্ডার দিয়ে খানিক সময়ের মধ্যে সেলসবয়রা চাহিদা অনুসারে সেইসব সামগ্রী ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে অপেক্ষা করার যে অমূল্য গুণ, মানুষের জীবন থেকে তাও উধাও করে দিচ্ছে। ই-কমার্সের এই রমরমায় উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রকও। খোদ কেন্দ্রীয বাণিজ্যমন্ত্রী ক্রেতাদের ই-কমার্স বা অনলাইন প্রবণতা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, “এর জেরে সামাজিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।“
এই পরিস্থিতি কোন পথে মোকাবিলা করা যাবে, এসম্পর্কে এখনও কোনও দিশা দেখাতে পারেনি সরকার। এদিকে বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে যে হার্দিক সম্পর্ক ছিল গত কয়েক দশকও আগেও তা শহরাঞ্চলে লুপ্তপ্রায়।
একসময়ে দোকানির কাছে গৃহস্থরা ধারবাকি করতেন। মাস ফুরোলে বেতন পাওয়া পরে সেই ধার মেটাতেন। সেকালে এই সংস্কৃতি কার্যত মানুষে-মানুষে সুসম্পর্ক এবং বিশ্বাসের সংস্কৃতি ছিল। তা হারাচ্ছে ভারতের মেট্রো শহরগুলিতে। গ্রামাঞ্চলে এখনও যদিও তা টিকে আছে কিছুক্ষেত্রে।
অনলাইনের এই দাপট যে আরও বৃদ্ধি পাবে, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, বহুক্ষেত্রে অনলাইনে প্রেরিত সামগ্রীতে খুঁত ধরা পড়ছে। দেখা যাচ্ছে, নিম্নমানের সামগ্রী সরবরাহ করছে বিভিন্ন কম্পানি। যা ফেরত দেওয়ারও উপায় নেই।
ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা করলে সমস্যার নিষ্পত্তি হতে পারত। হতও একসময়ে। বিশেষত ৮০ কিংবা ৯০-এর দশক পর্যন্ত। এদিকে বর্তমানে দেশের আদালতগুলিতে গুচ্ছ গুচ্ছ মামলা ঝুলে থাকায় ক্রেতাস্বার্থ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা ঝক্কির ব্যাপার।
এককথায় বললে বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা কার্যত বিফলে গিয়েছে। বাজারে গিয়ে নিজের হাতে বেছে শাক-সবজি, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে অন্যান্য সামগ্রী কেনার যে আনন্দ, সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত এই প্রজন্ম।
বাংলা তথা ভারতের পরাধীন এবং স্বাধীনতার পরের আমলের ইতিহাসই যদি ধরি, তাহলে দেখা যাচ্ছে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব নিজের হাতে বাজার করে প্রভূত আনন্দ পেতেন। সংস্কৃতি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কিংবা সরকারি, বেসরকারি কর্মীরা অথবা তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অনেকেই প্রতিদিন টাটকা বাজার করতে বেরোতেন।
এক্ষেত্রে নামী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের হাতে বাজার করতে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। আরেক প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাজারে যেতেন প্রায় নিয়মিতই। বিশিষ্ট সাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় দৈনিক একটি বাংলা সংবাদপত্রে “বাজার সরকার” নামে যে কলমটি লিখতেন, তা পাঠক-পাঠিকাকে রসের জোগান দিয়েছে বহুদিন।
বাজার করার মধ্যে বিশেষ এক দর্শন আছে। এই দর্শন কোনও পুঁথিগত বিদ্যা নয়। বাছা্ইয়ের আনন্দ, কোনটি খা্ঁটি আর কোনটি ভেজাল, তা চেনার ক্ষমতা মানুষ নিজের হাতে বাজার করেই অর্জন করতে পারে। তা সে আমিষ হোক কিংবা নিরামিষ, যাই হোক না কেন। সেই পাট লাটেয় উঠেছে অনলাইনের সহজসভ্যতায়।
আসলে জীবনে অনেক কিছু হারায়। এমনকি বিধাতার মর্জিমাফিক অমূল্য প্রাণটিও হারায় পৃথিবীর যে কোনও প্রাণি। এই নিয়ম এক প্রাকৃতিক নিয়ম। কিন্তু অনলাইন কিংবা ই-কমার্স কোনও প্রাকৃতিক নিয়ম নয়। এই নিয়ম মানুষ সৃষ্টি করেছে, যা স্বখাতসলিলে ডুবে মরার মতো।