নিজস্ব সংবাদদাতা : সাম্প্রতিককালে বিরোধী জোটের দৃষ্টান্তমূলক চিত্রটি ফুটে উঠল বৃহস্পতিবার রাহুল গান্ধীর বাসভবনে নৈশভোজে। একত্রিত হলেন ইন্ডিয়া জোটের ২৫টি দলের প্রায় ৫০ জন শীর্ষ নেতা। যাঁদের মধ্যে ছিলেন, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও ব্রায়েন, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, সিপিআই (এম)-এর এমএ বেবি, এনসিপি-এসপি নেতা শারদ পাওয়ার, ফারুক আবদুল্লাহ, পিডিপির মেহবুবা মুফতি, আরজেডির তেজস্বী যাদব, শিবসেনা-ইউবিটি প্রধান উদ্ধব ঠাকরে, ডিএমকে-র তিরুচি শিবা, সিপিআই(এম), সিপিআই (এম), সিপিআই (এমপিআই), সিপিআই (এমপিআই), সিপিআই (এমপিআই) এর প্রথম সারির নেতারা। ছিলেন দীপঙ্কর ভট্টাচার্য ও এমএনএম প্রধান কমল হাসান, কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া, হিমাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুখবিন্দর সিং সুখু এবং তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেভান্থ রেড্ডিও।

এসআইআর ও উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী জোটের এই সম্মিলিত ছবি দেখা গেল বহুদিন বাদে। মূলত রাহুল গান্ধীর উদ্যোগে এই নৈশভোজের উদ্দেশ্য ছিল দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন কৌশল কী হতে পারে তার একটা রূপরেখা তৈরি করা এবং একইসঙ্গে ঐক্যের বার্তা দেওয়া।
এদিন বৈঠকে লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী তাঁর “ভোট চুরি” ইস্যুতে একটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলেন। গত কয়েকদিন ধরে তিনি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে ‘ভোট কারচুপির সুসংগঠিত ষড়যন্ত্র’-এর অভিযোগ নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। এই নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের পথে গিয়েছেন তিনি। যেখানে তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিজেপি এই জালিয়াতি তোলেন তিনি। সরাসরি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিজেপির সঙ্গে মিলে এই ভোট জালিয়াতি করেছে। যা ইতিমধ্যে চ্যালেঞ্জ করেছে নির্বাচন কমিশন।

এদিন নৈশভোজে রাহুল গান্ধী ভোট জালিয়াতির বিষয়ে যে উপস্থাপন করলেন তার শিরোনাম ছিল ‘গণতন্ত্র ধ্বংস’। যেখানে বুথ-ভিত্তিক কারচুপির অভিযোগে বিস্তারিত তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন তিনি। এই উপস্থাপনা প্রথমে ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের কাছে এবং পরে দিল্লিতে কংগ্রেস দফতরে সাংবাদিকদের সামনে পেশ করা হয়।

ওই উপস্থাপনায় তিনি দাবি করেছেন, বেঙ্গালুরু সেন্ট্রাল লোকসভা কেন্দ্রের মহাদেবপুরা বিধানসভা এলাকায় ১,০০,২৫০টি জাল ভোট তৈরি করা হয়েছে। রাহুলের অভিযোগ, বিজেপি মহাদেবপুরা বিধানসভা আসনে ১,১৪,০৪৬ ভোটের অস্বাভাবিক লিড পায়, যার ফলে মাত্র ৩২,৭০৭ ভোটে তারা বেঙ্গালুরু সেন্ট্রাল আসনটি জেতে। অথচ বাকি বেশিরভাগ সেগমেন্টেই কংগ্রেস এগিয়ে ছিল। উদাহরণস্বরূপ রাহুল কিছু তথ্য তুলে ধরেন। যেমন- গুরকিরত সিং ডাং-এর নাম চারটি বুথে, আদিত্য শ্রীবাস্তব ও বিশাল সিং— যাঁদের নাম একাধিক রাজ্যে ভোটার তালিকায়। রাহুলের অভিযোগ,, নির্বাচন কমিশন মেশিন রিডেবল ভোটার লিস্ট ও বুথের সিসিটিভি ফুটেজ দিতে অস্বীকার করেছে। এইসঙ্গে তিনি বলেছেন, নির্বাচন কমিশন আইন পরিবর্তন করে রাজনৈতিক দলের পর্যবেক্ষণের সুযোগ সীমিত করেছে। এটা শুধু কর্ণাটকে নয়, মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানাতেও একই রকম কারচুপি হয়েছে বলে দাবি করেন রাহুল। তিনি বলেন, মহারাষ্ট্রে এক বছরে ১ কোটি নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে, যা অত্যন্ত সন্দেহজনক। সন্ধ্যা ৫টার পর হঠাৎ ভোট শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় সেই সন্দেহকে আরও গাঢ় করে।

এই সমস্ত অভিযোগের ভিত্তিতে ইন্ডিয়া জোট দু’টি প্রধান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এক, ১১ অগস্ট নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে মিছিল– প্রমাণ জমা ও স্বচ্ছ নির্বাচনের দাবিতে। দুই, বিহারে এমজিবি যাত্রা– ১৭ অগস্ট শুরু হয়ে ১ সেপ্টেম্বর পাটনায় শেষ হবে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে এই যাত্রায় গণসংযোগ ও ভোট কারচুপির বিরুদ্ধ বার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে বলে ইন্ডিয়া জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই যাত্রার মাধ্যমে তাঁরা গ্রামীণ স্তরে ইস্যু নিয়ে জনমত গড়ে তুলতে উদ্যোগী হবেন।
কংগ্রেস নেতা গৌরব গগৈ এই বৈঠককে “ইতিবাচক” বলে অভিহিত করেছেন। সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে তিনি জানিয়েছেন, “রাহুল গান্ধী একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দিয়েছেন, তিনি বেশ কয়েকটি উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন যে আজ বিহারে যা ঘটছে তা দেশের যে কোনও জায়গায় ঘটতে পারে।” সিপিআই-এর সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা বলেন, “আজকের বৈঠকটি অত্যন্ত অর্থবহ ছিল, বিষয় ছিল চলমান বিতর্ক, এসআইআর, এবং নির্বাচন কমিশন কীভাবে কাজ করছে, ভোটার তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কীভাবে ভুল কাজ করা হচ্ছে, তাদের পরিচয়পত্রের ক্ষেত্রে কীভাবে ভুল করা হচ্ছে,” । ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রধান ফারুক আবদুল্লাহ বলেন, “আমি দেখেছি কিভাবে ভোট চুরি করা হয়।“ তাঁর দল রাজ্য পুনরুদ্ধারের বিষয়টি এবং বিশিষ্ট লেখকদের ২৫টি বই নিষিদ্ধ করার বিষয়ে নতুন করে ব্যাপক বিতর্কের বিষয়টি তুলে ধরেছে বলে জানান ফারুক।
