ওঙ্কার ডেস্ক: ভারতের উপর শুল্ক চাপিয়ে ‘শাস্তি’ দিতে চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু শুল্ক-যুদ্ধ ঘিরে এবার তাঁরই দেশের অর্থনীতি পড়তে পারে চরম সংকটে। এমনই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (এসবিআই)। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ভারতের উপরে ট্রাম্পের ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপকে ‘খারাপ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত’বলে উল্লেখ করে এসবিআই স্পষ্ট জানিয়েছে এর জেরে কমতে পারে আমেরিকার জিডিপি বৃদ্ধির হার, বাড়বে মুদ্রাস্ফীতি এবং দুর্বল হয়ে পড়বে ডলার।
তিনটি দিক থেকে একসঙ্গে চাপ আসলে যে কোনও দেশের অর্থনৈতিক ভিত নড়বড়ে হয়ে উঠতে পারে। আর তা যদি হয় বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির ক্ষেত্রে, তার প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাজারেও মত বিশ্লেষকদের। এসবিআইয়ের রিপোর্ট বলছে, অতিরিক্ত শুল্কের কারণে আমেরিকার সাধারণ মানুষকে স্বল্প মেয়াদে বছরে গড়ে ২,৪০০ ডলার বেশি খরচ করতে হতে পারে। নিম্ন আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে এই ব্যয় ১,৩০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে, আর উচ্চ আয়ের পরিবারগুলির জন্য তা হতে পারে ৫,০০০ ডলারের কাছাকাছি।
স্টেট ব্যাঙ্ক জানাচ্ছে, বিপদ বাড়বে চিকিৎসা এবং বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের ক্ষেত্রে। এত দিন পর্যন্ত ভারত থেকে যাওয়া ওষুধ, রত্ন, অলঙ্কার ও ইলেকট্রনিক পণ্যে কোনও শুল্ক নিত না আমেরিকা। ট্রাম্পের নির্দেশে এখন এই সবের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসবে। তার জেরে মার্কিন বাজারে ওষুধের দাম ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, বৈদ্যুতিন পণ্যের দাম ২০ শতাংশ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসবিআই আরও জানিয়েছে, ভারত থেকে আমদানিকৃত ওষুধের উপরে নির্ভর করে আমেরিকার ৪০ শতাংশ ফার্মাসিউটিক্যাল বাজার। ট্রাম্পের শুল্কনীতির জেরে ভারতে উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে রাজস্ব দুই থেকে চার শতাংশ কমে যেতে পারে। বাজারে ঘাটতি তৈরি হলে ওষুধে কালোবাজারিও বাড়তে পারে।
প্রথম প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ট্রাম্প যে শুল্কনীতি চালু করেছিলেন, তার ফলেই ২০১৮ সালে অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাত উৎপাদনে বড় ধাক্কা খায় আমেরিকা। ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, সেসময়ে ঘরোয়া উৎপাদনে সামান্য বাড়তি চাকরি তৈরি হলেও, ইস্পাতের দাম এতটাই বাড়ে যে গাড়ি, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিনের মতো বহু খুচরো শিল্পে ৭৫ হাজারের বেশি চাকরি হারাতে হয়। শুল্কের চাপ সামলাতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কোকা কোলা, ফোর্ড, বস্ত্র ও মহাকাশ শিল্প। এই আবহে আবারও সেই একই পথে হাঁটছেন ট্রাম্প যা একাধিক শিল্পপতি ও সংস্থার কাছে উদ্বেগের বিষয়।
ভারতের অর্থনীতির ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে। আমেরিকাই ভারতের রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার যেখানে যায় দেশের মোট রফতানি সামগ্রীর ২০ শতাংশ। ফলে ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্ত ভারতের ব্যবসায়িক ঘরানার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষত রত্ন, বস্ত্র ও ওষুধ শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনায় রয়েছে। তবে এসবিআই রিপোর্টের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল এই বার্তা ট্রাম্পের এই শুল্কনীতি শুধু ভারতের নয়, আসলে আমেরিকার নিজস্ব অর্থনীতিরই ক্ষতি করছে।
পরিকাঠামো ছাড়াই দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর স্বপ্ন, চড়া দামে আমদানি, মুদ্রাস্ফীতির দৌরাত্ম্য সব মিলিয়ে ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে ‘বুমেরাং’বলেই অভিহিত করেছেন বিশ্লেষকেরা। আর সবচেয়ে আশঙ্কার কথা যদি চিন, ইইউ বা কানাডার মতো দেশও পাল্টা শুল্ক আরোপ করে, তবে আমেরিকান অর্থনীতি বিশ্ববাজারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। এখন দেখার, এসবিআইয়ের এই সতর্কবার্তা ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক-অভিযানে কতটা প্রভাব ফেলে।
