ওঙ্কার ডেস্ক: রাজ্যসভার সাংসদ, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী এবং ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শিবু সোরেন প্রয়াত। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১। পরিবার সুত্রে খবর, তিনি এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দিল্লির স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং গত কয়েকদিন ধরে তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। সোরেনের ছেলে এবং ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন তাঁর বাবার মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, প্রিয় দিশোম গুরুজি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আজ আমি সবকিছু হারিয়েছি। ঝাড়খণ্ডের মন্ত্রী ইরফান আনসারি বলেছেন, “এই ক্ষতি ঝাড়খণ্ডের জন্য অনেক বড়। তিনি আমাদের ঝাড়খণ্ড দিয়েছেন, এবং তাঁর কারণেই আমরা বেঁচে গেছি।” বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতারা হাসপাতালে সোরেন পরিবারের সাথে দেখা করে তাদের সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান হরিবংশ।
শিবু সোরেন অনুগামীদের কাছে ‘গুরুজি’ নামে পরিচিত ছিলেন। সোরেন ছিলেন একজন বিশিষ্ট আদিবাসী নেতা যিনি পৃথক ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠনের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এদেশে স্বাধীনতোত্তর আদিবাসী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। জন্ম ১১ জানুয়ারি, ১৯৪৪ সালে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে লড়াই ও পৃথক রাজ্যের দাবিতে তির-ধনুক হাতে নেমে পড়েন খনিজ সম্পদে ভরপুর ঝাড়খণ্ড এলাকায়। সঙ্গী ছিলেন মাত্র দুজন। একজন হলেন বাঙালি মার্কসবাদী শ্রমিক সংগঠনের নেতা এ কে রায় এবং অন্যজন কুর্মি-মাহাত নেতা বিনোদবিহারী মাহাত। ১৯৭২ সালে তাঁরা গঠন করেন নবযুবক সঙ্ঘ যা পরে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা নামে আত্মপ্রকাশ করে। সোরেন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাঁর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ ঝাড়খণ্ডের সাধারণ মানুষ।
দিশম গুরু শিবু সোরেন, এক বিপ্লবী আদিবাসী নেতা, যাঁর জীবন কাহিনি শুরু হয় রাজনৈতিক বিতর্ক দিয়ে। তাঁর জন্ম হয় পূর্বতন বিহারের রামগড় জেলার নেমরা গ্রামে, সাঁওতাল উপজাতির অন্তর্ভুক্ত এক পরিবারে। ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময়ই মহাজন গুন্ডারা খুন করে তাঁর বাবাকে। সেই ঘটনার পর ১৮ বছর বয়সে তিনি গঠন করেন ‘সাঁওতাল নবযুবক সংঘ’। জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের সংগঠিত করতে শুরু করেন আন্দোলন। আদিবাসী, কুর্মি-মাহাতোদের জমি পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি গড়ে তোলেন সালিশিসভা বা খাপ পঞ্চায়েত এবং কখনও কখনও পরিচালনা করেন নিজস্ব আদালতও। সাঁওতালি ভাষায় তাঁর আন্দোলনের স্লোগান ছিল ‘লাঙল যার, ফসল তার’ এই আন্দোলন তৎকালীন শাসকশ্রেণির চোখে পড়ে। ১৯৭৫ সালের ২৩ জানুয়ারি ‘বহিরাগত’ বা অ-উপজাতীয়দের তাড়ানোর অভিযানে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। সেই অভিযানে অন্তত ১১ জন নিহত হন বলে অভিযোগ, যার মধ্যে ৯ জনই ছিলেন মুসলিম। তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয় এবং মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে চলে। শেষমেশ ২০০৮ সালের ৬ মার্চ আদালত তাঁকে বেকসুর খালাস দেয়।
শিবু সোরেনের রাজনৈতিক কেরিয়ার শুরু হয় ১৯৭৭ সালে লোকসভা নির্বাচনে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ১৯৮০ সালে দুমকা থেকে প্রথমবার লোকসভায় নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮৯, ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০৪ সালেও লোকসভায় নির্বাচিত হন। ২০০২ সালে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হলেও পরবর্তীকালে উপনির্বাচনে দুমকা থেকে জিতে রাজ্যসভার আসন ত্যাগ করেন। মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন সরকারে কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রী নিযুক্ত হন। কিন্তু চিরুডিহ হত্যাকাণ্ডে তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ায় তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। সেই সময় তিনি আত্মগোপনও করেন এবং পরে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে থাকেন। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর আবারও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ফিরে আসেন কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে। ২০০৫ সালে ঝাড়খণ্ড বিধানসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও রাজনৈতিক দর কষাকষির মাধ্যমে তিনি মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তবে বিধানসভায় আস্থা ভোটে হেরে মাত্র ৯ দিনের মাথায় তাঁকে ইস্তফা দিতে হয়।
২০০৬ সালে আবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন শশীনাথ ঝা হত্যাকাণ্ডে। অভিযোগ, ঝা ছিলেন তাঁর প্রাক্তন ব্যক্তিগত সচিব এবং ১৯৯৪ সালের ২২ মে দিল্লির ধৌলাকুয়াঁ এলাকা থেকে তাঁকে অপহরণ করে হত্যা করা হয় রাঁচির কাছে। সিবিআই-এর চার্জশিটে বলা হয়, ১৯৯৩ সালে পি ভি নরসিমা রাও সরকারের অনাস্থা প্রস্তাবের সময় কংগ্রেস ও জেএমএমের মধ্যে কথিত গোপন সমঝোতার বিষয়ে ঝা জানতেন। তিনি সেই বিষয়ে তথ্য ফাঁস করতে পারেন এই আশঙ্কায় তাঁকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এই মামলায় আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ২০০৬ সালের ৫ ডিসেম্বর তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এদিকে ২০০৭ সালের ২৫ জুন তাঁকে দুমকার জেলে নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর গাড়ির ওপর বোমা হামলা হয়, যেখানে ক্ষয় ক্ষতির খবর ছিল না। একই বছর ২৩ আগস্ট দিল্লি হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে তাঁকে খালাস দেয়
শিবু সোরেনের রাজনৈতিক জীবনের পতন শুরু হয় ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে, যখন তিনি দুমকা আসনে বিজেপির সুনীল সোরেনের কাছে পরাজিত হন। একদিকে আদিবাসী অধিকার রক্ষার মুখ, অন্যদিকে একাধিক গুরুতর মামলায় অভিযুক্ত শিবু সোরেনের জীবন ও রাজনীতি একেবারে দোদুল্যমান। ইতিহাসের বিচারে তিনি একজন আদিবাসী বীর না কি বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই প্রশ্ন হয়তো এখনও চূড়ান্ত জবাব পায়নি।
