স্পোর্টস রিপোর্টার, ওঙ্কার বাংলা: বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে ভারতীয় সময় শুক্রবার ভোরে, টরন্টো স্টেডিয়ামে রাউন্ড অফ ৩২-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হয় পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া। সেই ম্যাচেই ২-১ গোলে জয় পেল পর্তুগাল। তবে একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে। নিঃসন্দেহে কষ্টার্জিত জয়। তবে ভালো ফুটবল উপহার দিয়ে, লড়াই করেও হারতে হল ক্রোয়েশিয়াকে। কিন্তু অবশ্যই সেই লড়াই মনে রাখার মতো।
ম্যাচ শেষে টরেন্টোর মাঠে একরাশ হতাশা নিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে ক্রোয়েশিয়ার কিংবদন্তি ফুটবলার বহু লড়াইয়ের নায়ক লুকা মদ্রিচ। বেদনাভরা মুখে নিজের কান্নাটা লুকোনোর আপ্রাণ চেষ্টা। মাথাটা নাড়ছিলেন লুকা এমনভাবে, যাতে বোঝা যাচ্ছিল, দেশের জার্সিতে রাউন্ড অফ ৩২ এ পর্তুগালের কাছে ১-২ গোলে হেরে ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের আসর থেকে বিদায় নেওয়াটা মানতে পারছেন না। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার রানার্স ও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান পাওয়ার পিছনে মদ্রিচের ভূমিকা সকলেরই জানা। কিন্তু ২০২৬ এ ক্রোয়েশিয়ার দৌড় থেমে গেল নকআউটের প্রথম পর্যায়ে। বলা ভাল মদ্রিচের হল সারা, আর পর্তুগালের মেগা তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন, আশা জিইয়ে থাকল আরও এক ম্যাচ।
শেষ ষোলোয় স্পেনের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল। মেসি-রোনাল্ডো দ্বৈরথ আদৌ দেখা যাবে কিনা চলতি বিশ্বকাপে, আর সেটাও শেষ বারের জন্য, স্পেনের ইয়ামাল আর পর্তুগালের রোনাল্ডোর মধ্যে কে বাজিমাত করেন পরের রাউন্ডে, তার ওপর নির্ভর করছে সবকিছু। ফুটবলের গ্রেটরা এমনই হন। মদ্রিচ যখন ম্যাচ শেষে হারের যন্ত্রণায় বিদ্ধ, তখন ম্যাচ জেতার সাময়িক উচ্ছাস প্রকাশ করে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। বুকে জড়িয়ে ধরলেন মদ্রিচকে পরম শ্রদ্ধায়। দেশের জার্সিতে শেষবার খেলে ফেললেন মদ্রিচ এটা বলেই ফেলা যায়। পর্তুগাল হারলে ক্রিশ্চিয়ানোরও এটাই দেশের জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলা হয়ে যেত। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হারের দিন রোনাল্ডোর কান্না গ্যালারির প্রেসবক্সে বসে দেখেছিলাম। হারের ব্যথা রোনাল্ডো জানেন বলেই বন্ধু মদ্রিচকে সান্ত্বনা দিতে দ্বিধা করেননি তিনি। মদ্রিচকে কিছু একটা বললেন। হয়ত এটাই বললেন, তোমার দল ক্রোয়েশিয়া আজ হেরেছে ঠিকই, তবে তুমি হারোনি। তুমি সারাজীবন বিশ্বের মানুষের হৃদয়ে থেকে যাবে। এটাই তো তোমার জিত। তারপর মদ্রিচকে আরও একবার আলিঙ্গন করলেন রোনান্ডো। খেলার মাঠে এই সুযোগ তো আর আসবে না। রোনান্ডোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন মদ্রিচ।
এরপর একে একে সতীর্থরা তো বটেই, পর্তুগালের সব ফুটবলাররা মদ্রিচের সঙ্গে হাত মেলালেন, কেউ কেউ বুকেও জড়ালেন ফুটবলের এক লড়াকু যোদ্ধাকে। অনেকেরই হয়ত জানা আছে, ফুটবল মাঠে আসার আগে মদ্রিচের জীবন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এক শরনার্থী শিবিরে। ক্রোয়েশিয়ার গৃহযুদ্ধে পরিবারের নিকট আত্মীয়দের প্রাণ যাওয়ার পর বাড়ি ফেরা হয়নি মদ্রিচের। প্রাণ বাঁচাতে পরিবারের জীবিত সদস্যদের সঙ্গে তাঁর ঠাই হয়েছিল শরণার্থী শিবিরে। সেখান থেকে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখা ও লড়াই শুরু। পরে এসেছে ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠা ও অনেক সাফল্য। একটা সময় সবাইকেই থামতে হয়। সেটা সবসময় মধুর হয় না। মদ্রিচের ক্ষেত্রেও এই বিদায় বেদনার হলেও, তাঁর বিদায় ‘বিজয়ী’ বীরের মতোই। ম্যাচের শেষ দিকে দুই দলই আক্রমণের গতি অনেকটা বাড়ায়। ৮৭ মিনিটের মাথায়, রেনাতো ভেইগার হেডার বাইরে চলে যায়। ইনজুরি টাইমে, ক্রোয়েশিয়া দলে পরিবর্তন আসে। নিকোলা ভ্লাসিচের পরিবর্তে মাঠে নামেন ইয়োস্কো গার্দিওল। ম্যাচের ৯৪ মিনিটে, রাফায়েল লিওর অ্যাসিস্ট থেকে হেড দিয়ে গোল করে যান গনজালো র্যামোস এবং এটিই জয়সূচক গোল। কিন্তু গোটা ম্যাচে পর্তুগাল একেবারেই মন ভরানো ফুটবল খেলতে পারেনি। তবে খেলার ১০৩ মিনিটে, ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলার ইয়োস্কো গার্দিওলের গোল অফসাইডের জন্য বাতিল হয়ে যায়।