দিল্লি: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এবার নতুন ভোটারদের ফর্ম ৬ নিয়ে বড় ধাক্কা খেল নির্বাচন কমিশন।
কমিশন দাবি করেছিল, ফর্ম ৬-এর সঙ্গে বাড়তি ঘোষণাপত্র নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত, তাতে সুপ্রিম কোর্টের সায় রয়েছে। কিন্তু সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দিল, পরিবর্তিত ফর্ম ৬-এ শীর্ষ আদালত কোনও অনুমোদনই দেয়নি। এই পরিবর্তনে কে অনুমোদন দিয়েছিল, সেই প্রশ্নও তুলেছে আদালত।
নতুন ভোটাররা ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য ফর্ম ৬ পূরণ করেন। এবার এসআইআরের সময় কমিশন জানায়, ফর্ম ৬-এর সঙ্গে একটি অতিরিক্ত ঘোষণা দিতে হবে, যেখানে নতুন ভোটারকে জানাতে হবে আগের এসআইআরে তাঁর নিজের, বাবা-মা বা ঠাকুরদা-ঠাকুমার নাম ছিল কি না। এই ঘোষণা নিয়েই তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, এর জেরে বহু বৈধ ভোটারের নামও তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে।
‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে’র একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবিন্দর সিং সঁধু এই ফর্ম বদলের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ১৯৬০ সালের রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টরস রুলস সংশোধন না করে ফর্ম বদলানো বেআইনি। রিপোর্ট অনুযায়ী, তিনি এই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত এবং বেআইনি’ বলে আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর আপত্তি উপেক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই বিতর্কের মধ্যেই গত ২৬ সেপ্টেম্বর একটি বিবৃতি দিয়ে নির্বাচন কমিশন জানায়, ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যে ঘোষণাপত্র নেওয়া হচ্ছে, তা সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে। কমিশনের দাবি ছিল, এসআইআর ছাড়া অন্য সময়ে সাধারণভাবে নাম তোলার জন্য ১৯৬০ সালের নিয়ম মেনেই ফর্ম ব্যবহার করা হবে।
সোমবার সেই দাবিকেই নস্যাৎ করে দিল শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, “পরিবর্তিত ফর্ম ৬-এ আমরা কোনও অনুমোদন দিইনি। এটা পরিষ্কার করে দেওয়া দরকার।” তিনি আরও বলেন, “নথি জমা পড়লে আমরা দেখতে চাই, কে এই পরিবর্তন করেছে।” অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণের পরই বিরোধীরা সরব হয়েছে। তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, “কে দেশকে ভুল পথে চালিত করছে? এই দ্বন্দ্ব দেশের হৃদয় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।” ভোট চুরির অভিযোগও তোলেন তিনি।
এদিন পটনার বাসিন্দা রাকেশ কুমার সিংহ এবং আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর দায়ের করা মামলার শুনানি ছিল প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে একাধিক মামলা হয়েছে। তার মধ্যে একটি জনস্বার্থ মামলায় মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জ্ঞানেশ কুমারকে সাসপেন্ড করার আর্জি জানানো হয়েছে। এছাড়াও এসআইআর পর্বে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগে বিচারবিভাগীয় তদন্ত বা সিট গঠনের দাবিও করা হয়েছে। এদিন আদালত এই সমস্ত বিষয়ে কেন্দ্র এবং নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চেয়ে নোটিস পাঠিয়েছে।
তবে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে;র রিপোর্টের ভিত্তিতে এখনই কোনও নির্দেশ দিতে রাজি হয়নি আদালত। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, “কোনও সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ১০০ শতাংশ সঠিক, আংশিক সঠিক বা ভুল হতে পারে। তার ভিত্তিতে এই মুহূর্তে আমরা কোনও নির্দেশ দিতে পারি না। আমরা অবশ্যই কমিশনের জবাব চাইব। যদি দেখি আইন মানা হয়নি, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেব।”
একই সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারকে সাসপেন্ড করার আর্জিতেও কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়নি আদালত। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ জানিয়েছে, “নোটিসের পর যদি দেখা যায় কোনও সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়নি, তাহলে আমরা সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেব। সব সিদ্ধান্তই একতরফা নেওয়া হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না।”