ওঙ্কার ডেস্ক: ইরানের মিনাবে স্কুলে ভয়াবহ হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে, কারণ তেহরান সরাসরি অভিযোগ তুলে দাবি করেছে এই মৃত্যুমিছিলের নেপথ্যে রয়েছেন মার্কিন মুলুক, আর তা নেতৃত্ব দিয়েছে নৌসেনার দুই আধিকারিক। শুধু অভিযোগই নয়, ওই দুই কর্মকর্তার ছবি প্রকাশ করে তাঁদের ‘খুনি’ তকমাও দিয়েছে ইরান সরকার।
ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক স্কুলে এই ভয়াবহ বিমান হামলাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সংঘাতের আবহে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় বহু নিরীহ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে।
ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ২৮-এ ফেব্রুয়ারি। এদিন ইরানের উপর যৌথ হামলা চালায় ইজরায়েল এবং আমেরিকা। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, হামলার সময় স্কুলে নিয়মিত ক্লাস চলছিল। হঠাৎ করেই আকাশপথে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র স্কুল ভবনে আঘাত হানে। মুহূর্তের মধ্যে ভবনটির একটি বড় অংশ ধসে পড়ে এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায় বহু ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা কেঁপে ওঠে। সরকারি তথ্য অনিযায়ী ঐ হামলায় প্রায় ১৫০ নিহত হন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই নাবালিকে শিশু। উদ্ধারকাজ শুরু হয় দ্রুত, কিন্তু ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের বের করে আনা ছিল অত্যন্ত কঠিন। স্থানীয় প্রশাসন, উদ্ধারকারী দল এবং স্বেচ্ছাসেবীরা দিনরাত এক করে কাজ চালান। বহু আহতকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালগুলিতে উপচে পড়ে আহতদের ভিড়, চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে, যাদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।
এই হামলার দায় নিয়ে শুরু হয়েছিল তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন। ইরান সরকার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে এটিকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হামলা, যেখানে নিরীহ নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সেই সঙ্গেই অভিযুক্ত দুই মার্কিন নৌসেনা কর্মকর্তার নাম ও পরিচয় প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে তেহরান।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে সরাসরি দায় স্বীকার না করলেও জানিয়েছে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করেনি। প্রাথমিক পর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তো সরাসরি ইরনাকেই এই হামলের নেপথ্যে দায়ী করেছিল। পরে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে এবং প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভুল ব্যাখ্যা বা লক্ষ্য নির্ধারণে ত্রুটির কারণে এই বিপর্যয় ঘটতে পারে। হামলার পর কিছু স্বাধীন বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তদন্তে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করে জানা যায় এই হামলা তোমাহক মিসাইল দ্বারা করা হয়েছে যা বর্তমানে যুদ্ধ লিপ্ত তিনটি দেশের মধ্যে একমাত্র আমেরিকার কাছেই আছে। এছাড়াও স্যাটেলাইট চিত্র, হামলার ভিডিও ফুটেজ এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য মার্কিন সামরিক অস্ত্রের সঙ্গে মিল রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলেও এই হামলা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলি অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে। বহু দেশ এই ঘটনাকে নিন্দা করে বলেছে, যেকোনো পরিস্থিতিতেই বেসামরিক নাগরিক, বিশেষ করে শিশুদের লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।