ওঙ্কার ডেস্ক : স্বচ্ছ ও নিরাপদ মোবাইল পরিষেবা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি এই সঞ্চার সাথী অ্যাপ-এর সূচনা। পরিসংখ্যান বলছে, এই মোবাইল অ্যাপটি ১.৪ কোটিরও বেশি বার ডাউনলোড করা হয়েছে। প্রায় ৪২ লক্ষেরও বেশি চুরি বা হারিয়ে যাওয়া মোবাইল ডিভাইস সফলভাবে ব্লক করা হয়েছে। ২৬ লক্ষ চুরি বা হারিয়ে যাওয়া মোবাইল ফোন ট্র্যাক করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭.২৩ লক্ষ ফোন সফলভাবে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়েছিল, এটি একটি গণতান্ত্রিক, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক, ব্যবহারকারী-চালিত প্ল্যাটফর্ম এবং গোপনীয়তাকে প্রথমে গুরুত্ব দেওয়া একটি অ্যাপ, যা শুধুমাত্র ব্যবহারকারীর সম্মতিতে সক্রিয় হয়।
ভারতে বেড়ে ওঠা সাইবার অপরাধগুলির প্রতি একটি সময়োচিত প্রতিক্রিয়া
এক বিলিয়নেরও বেশি গ্রাহক নিয়ে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মোবাইল ফোনগুলি এখন ব্যাঙ্কিং, বিনোদন, ই-লার্নিং, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি পরিষেবাগুলির গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে, ফলে মোবাইল নিরাপত্তা এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাইবার হুমকির কারণে মোবাইল ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা একটি জরুরি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্ডিয়ান কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (CERT-In)-এর মতে, সাইবার অপরাধের ঘটনা ২০২৩ সালের ১৫,৯২,৯১৭ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ২০,৪১,৩৬০-এ পৌঁছেছে। শুধুমাত্র ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টালে রিপোর্ট করা ডিজিটাল অ্যারেস্ট স্ক্যাম এবং সংশ্লিষ্ট সাইবার অপরাধের সংখ্যা ২০২৪ সালে ছিল ১,২৩,৬৭২-টি, যার মধ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ১৭,৭১৮-টি ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে।
ভারতের যোগাযোগ বিভাগ সঞ্চার সাথী মোবাইল অ্যাপটি চালু করে। এটি নাগরিক পরিষেবার মধ্যে পড়ে বলে যোগাযোগ দফতরের তরফে জানানো হয়েছিল। তাদের কথায়, এই অ্যাপটি সরাসরি ব্যবহারকারীদের স্মার্টফোনে শক্তিশালী নিরাপত্তা এবং জালিয়াতি-রিপোর্টিং করার সক্ষমতা নিয়ে এসেছে। পরিচয় চুরি, জাল কেওয়াইসি, ডিভাইস চুরি, ব্যাঙ্কিং জালিয়াতি এবং অন্যান্য সাইবার ঝুঁকি থেকে সহজে সুরক্ষা দিতে পারে এই অ্যাপটি । এই উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে, টেলিকমিউনিকেশন বিভাগ ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর নির্দেশনা জারি করে, যেখানে মোবাইল প্রস্তুতকারক ও আমদানিকারকদের জন্য ভারতে ব্যবহারকারীদের ডিভাইসে সঞ্চার সাথী অ্যাপটির বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যোগাযোগ মন্ত্রনালয় থেকে জানানো হয়, ভারতের সাইবার নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করার জন্য এটি ডিজাইন করা হয়েছে।
এই অ্যাপে চালু হওয়ার পর থেকে সারা দেশে ডিজিটাল জালিয়াতি কমিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর পোর্টালে (https://sancharsaathi.gov.in/) ২১.৫ কোটিরও বেশি বার প্রবেশ। ১.৪ কোটিরও বেশি অ্যাপ ডাউনলোড হয়েছে। প্রায় ৪২ লক্ষের বেশি চুরি বা হারিয়ে যাওয়া মোবাইল ডিভাইস সফলভাবে ব্লক করা হয়েছে। নাগরিকরা “আমার নম্বর নয়” হিসেবে চিহ্নিত করার পরে ১.৪৩ কোটিরও বেশি মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ২৬ লক্ষ হারিয়ে যাওয়া বা চুরি হওয়া ফোন ট্র্যাক করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭.২৩ লক্ষ ফোন তাদের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নাগরিকদের রিপোর্টের ভিত্তিতে ৪০.৯৬ লক্ষ জাল সংযোগ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত ৬.২ লক্ষ আইএমইআই ব্লক করা হয়েছে। ফিনান্সিয়াল ফ্রড রিস্ক ইন্ডিকেটর ৪৭৫ কোটি টাকা মূল্যের ক্ষতি প্রতিরোধ করেছে। যোগাযোগ বিভাগ ফিনান্সিয়াল ফ্রড রিস্ক ইন্ডিকেটর তৈরি করেছে, যা একটি ঝুঁকি-ভিত্তিক পরিমাপক। এটি মোবাইল নম্বরগুলিকে আর্থিক জালিয়াতির মাঝারি, বেশি বা খুব বেশি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে।
এফআরআই ব্যাঙ্ক, এনবিএফসি এবং ইউপিআই পরিষেবা প্রদানকারীদের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নম্বরগুলির জন্য প্রয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে এবং অতিরিক্ত গ্রাহক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করে।
এগুলির উপর ভিত্তি করে, উদ্যোগটি লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপের মাধ্যমে টেলিকম জালিয়াতিকে আরও নিয়ন্ত্রণে এনেছে, যা একাধিক প্ল্যাটফর্মে বাস্তব ফলাফল দিয়েছে। এর মাধ্যমে ৩ কোটিরও বেশি জাল মোবাইল সংযোগ বাতিল করা হয়েছে, ৩.১৯ লক্ষ ডিভাইস ব্লক করা হয়েছে, ১৬.৯৭ লক্ষ হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে এবং ২০,০০০ এরও বেশি বাল্ক এসএমএস প্রেরককে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে,যা সারা দেশে টেলিকম-সম্পর্কিত জালিয়াতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে এবং ব্যবহারকারীর সুরক্ষা বাড়িয়েছে। ফলে এই মোবাইল অ্যাপটি ভারতে বেড়ে ওঠা সাইবার অপরাধ ঠেকাতে একটা কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছে বলে যোগাযোগ দফতর মনে করে। এটি হিন্দি এবং আরও ২১-টি আঞ্চলিক ভাষায় উপলব্ধ, যা এটিকে সারা দেশে ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছে।
এটি ব্যবহারকারীদের কল, এসএমএস, বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সন্দেহজনক জালিয়াতির যোগাযোগগুলি বিশেষ করে কেওয়াইসি আপডেটিং স্ক্যাম – রিপোর্ট করতে সক্ষম। এই সক্রিয় রিপোর্টিং সরঞ্জামটি DoT-কে জাল কেওয়াইসি এবং পরিচয় চুরির ঘটনাগুলি দ্রুত পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করে এবং নাগরিকদের অনাকাঙ্ক্ষিত বাণিজ্যিক যোগাযোগ রিপোর্ট করতে উৎসাহিত করে।
এটি ভারতের যেকোনো জায়গায় হারিয়ে যাওয়া বা চুরি হওয়া ফোন ট্র্যাক করতে এবং ব্লক করতে সহায়তা করে। এটি পুলিশকে চুরি হওয়া ডিভাইস খুঁজে বের করতে সাহায্য করে এবং ডিভাইস ক্লোনিং-এর প্রচেষ্টা ব্লক করে। এটি কেনা মোবাইল ডিভাইসটি আসল কিনা, তা যাচাই করতে পারে। এটি নাগরিকদের +৯১ দিয়ে শুরু হওয়া দেশীয় কল হিসেবে ছদ্মবেশী আন্তর্জাতিক কলগুলির রিপোর্ট করতে সাহায্য করে। এটি ব্যবহারকারীদের একটি পিন কোড, ঠিকানা, বা আইএসপি নাম প্রবেশ করিয়ে সারা ভারতে ওয়্যারলাইন ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারীদের বিবরণ যাচাই করতে দেয়। এর মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের ডিজিটাল পরিচয় সুরক্ষিত করতে এবং টেলিকম জালিয়াতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম। সঞ্চার সাথীর একটি ক্লিকেই ব্যবহারকারীদের স্প্যাম এবং জাল কল ও মেসেজ রিপোর্ট করার সুযোগ দিয়ে ট্রাইয়ের টেলিকম কমার্শিয়াল কমিউনিকেশনস কাস্টমার প্রেফারেন্স রেগুলেশনস কার্যকর করতেও সহায়তা করে।
সঞ্চার সাথী ব্যবহারকারীর গোপনীয়তাকে অগ্রাধিকার দেয় এবং পরিষেবা প্রদানের জন্য শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে। প্ল্যাটফর্মটি বাণিজ্যিক বিপণনের জন্য প্রোফাইল তৈরি করে না, বা তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে ব্যবহারকারীর ডেটা শেয়ার করে না। আইনিভাবে প্রয়োজন হলে ডেটা ভাগ করে নেওয়া কঠোরভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা অননুমোদিত প্রবেশ এবং ডেটার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করে। প্ল্যাটফর্মটির গোপনীয়তা অনুশীলনগুলি ডিজিটাল ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা আইন ২০২৩-এর সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ, যা ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতাকে গুরুত্ব দেয়।
