অর্ণব দত্ত
নাবালিকা বিবাহ রুখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে আশা করা যায়। ২০১১ সালের পরে নতুন করে সারা দেশব্যাপী জনগণনার কাজ ২০২৭ সালে সমাপ্ত হবে। সর্বশেষ জনগণনার তথ্যানুসারে, ভারতে নাবালিকা বিধবার সংখ্যা এখন ১ লক্ষ ৯৪ হাজার। সারা দেশের বিভিন্ন রাজ্যে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা এই নাবালিকা বিধবাদের।
সূত্রের খবর, ভারতে মোট যত সংখ্যক বিধবা রয়েছে, এদের মধ্যে শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশই নাবালিকা। যাদের বয়স ১০ বছর থেকে শুরু করে হয়তোবা সবেমাত্র ১৮ পেরিয়েছে।
গ্লোবাল মেন্টাল হেলথ নামে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা দাবি করছে, বহুক্ষেত্রে নাবালিকা তথা কিশোরীদের বৈধব্যের হার নথিভুক্ত করা হচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে নাবালিকা বিধবার সংখ্যা তুলনায় অনেক বেশি। এদিকে ভারতে নাবালিকা বিবাহ নিষিদ্ধ।
এসত্ত্বেও নাবালিকা বিবাহ ঘটছে কেন, এসম্পর্কে একাধিক গবেষনায় উদ্বেগজনক তথ্য হাতে এসেছে। অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যে সমস্ত নাবালিকার বিয়ে দিচ্ছেন অভিভাবকরা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে তুলনায় আর্থিকভাবে সম্পন্ন প্রবীণ নাগরিকদের সঙ্গে। এই সমস্যা যে জটিল সামাজিক ব্যাধি, একথাও বলার অপেক্ষা রাখে না।
২০২৭ সালের জনগণনার ফল প্রকাশের পরে দেখা যাবে, এক্ষেত্রে পরিস্থিতি বর্তমানে সঠিকভাবে কোন অবস্থায় রয়েছে। তবে নাবালিকা বিধবা এখন সারা বিশ্বের গুরুতর সমস্যা। রাষ্ট্রসঙ্ঘের হিসেব অনুসারে, সারা বিশ্বে ১০ লক্ষাধিক নাবালিকা বিধবার বসবাস। এদের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক নাবালিকার বিধবার বাস দক্ষিণ এশিয়ার নানান দেশে। যার ভিতর রয়েছে ভারতও।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, নাবালিকা বিধবাদের উপর বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। ভারতের প্রতিবেশী বাংলাদেশেও দারিদ্রের সুযোগে নাবালিকাদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রবীণ নাগরিকদের সঙ্গে। একইসঙ্গে বাল্য বিধবার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিবেশী বাংলাদেশেও।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে নাবালিকা বিবাহ প্রতিরোধে লোকসভায় একটি সংশোধনী বিল পেশ করা হয়। ওই সংশোধনী বিলটি এখনও পাসই হয়নি। বলাবাহুল্য, বিলটি আইনে পরিণত হলে নাবালিকা বিবাহের সামাজিক ব্যাধির প্রকোপ রোধ করা যেত খানিকটা। ভারতই কেবল নয়, সারা বিশ্বের উপরতলার রাজনীতি সম্পর্কে সাধারণ নাগরিকরা বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠছেন। নাগরিকদের অনেকেই মনে করছেন, রাজনীতি অভিজাত সম্প্রদায়ের কারবার। রাজা আসে, রাজা বদলায়, দিন বদলায় না-এর মতো যেন।
ভারতে নাবালিকা বিবাহ প্রতিরোধ বিল গত পাঁচ বছর ধরে লোকসভায় ঠাণ্ডাঘরে পড়ে থাকলেও সেটি আইনে পরিণত করতে হুঁশ নেই কেন উপরতলার রাজনীতিকদের, এ প্রশ্ন প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে আসছে। প্রস্তাবিত ওই বিল অনুসারে, কন্যা সন্তানের বিয়ের বয়স ১৮ বছর থেকে বৃদ্ধি করে ২১ বছর করার কথা।
ভারতে ব্রিটিশ আমলে নাবালিকা বিবাহ প্রতিরোধ আইন ১৯৩০ সালের পয়লা এপ্রিল খেকে চালু করা হয়। এক্ষেত্রে কন্যা সন্তানের ন্যূনতম বয়স ১৪ বছর এবং পুত্র সন্তানের বিবাহের ন্যূনতম বয়স ধার্য করা হয় ১৮ বছর। পরে ১৯৭৮ সালে ওই আইন সংশোধিত করে কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে ১৮ বছর এবং পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে তা ২১ বছর করা হয়। ফের ওই আইন শেষবার সংশোধিত হয় ২০০৭ সালের পয়লা নভেম্বর। তবে এনিয়ে বিতর্কও বাঁধে। ২০০৬ সালের একাধিক মুসলিম সংগঠন সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে আর্জি জানায়, ভারতীয় নাগরিক মুসলমান মহিলাদের এই আইনের আওতার বাইরে রাখতে হবে।
বর্তমানে রাষ্ট্রসঙ্ঘ বাল্য বিবাহ নিয়ে যারপরনাই উদ্বিগ্ন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের তরফে নতুন যে প্রস্তাবনা আনা হয়েছে তাতে একথা বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী ৬৫০০ লক্ষ কন্যা সন্তান, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে অভিভাবকরা তাদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন।
আধুনিক বিশ্বে এই সমস্যা প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে পৃথিবীর সেইসব দেশগুলিকে যেখানে নাবালিকা বিবাহ এখনও ব্যাপক হারে চালু। সম্প্রতি রাষ্ট্রসঙ্ঘ জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে এই প্রস্তাবনা এনেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নাইজেরিয়ার পরিস্থিতি সবচেয়ে করুণ। নাইজেরিয়ায় ১৮ বছর বয়সের আগেই ৮০ শতাংশ কন্যা সন্তানের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন অভিভাবকরাই।