আন্দোলন ও অবরুদ্ধতা
ভারতীয় রাজনীতিতে এখন সংবিধানিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধের তর্জা তুঙ্গে। জ্ঞানেশ ইস্যুতে শাসক ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে বাদানুবাদ যে ভাবে কার্যত সংঘর্ষের আকার নিচ্ছে তাতে আমাদের সংবিধানিক অধিকার প্রসঙ্গে সচেতনতা আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। বৃহৎ ভাবে বলতে গেলে ভারতের সাম্প্রতিক রাজনীতি এখন বিচারালয়ের দ্বারস্থ। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে শাসক, বিরোধীরা ন্যায় বিচার চেয়ে আদলতে ছুটছে। এতে বিশেষত দেশের রাজনীতিকদের অজ্ঞতাই ফুটে উঠছে। যেটা একটি গণতান্ত্রিক দেশের পক্ষে আদৌ সুখকর নয়। সংসদীয় রাজনীতির পথ ধরে যাঁরা জনপ্রতিনিধি হচ্ছেন, তাঁরা যদি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন তাহলে দেশের সংবিধান সুরক্ষার ক্ষেত্রটি প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য। দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এই দুর্বলতাকে বড় বেশি স্পষ্ট করে তুলছে। বর্তমানে যে ভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন অবরুদ্ধ হচ্ছে, তাতে সংবিধানের দোহাই দিয়ে উভয় পক্ষই কী এক কাল্পনিক পক্ষপাতিত্বের শিকার হচ্ছে না ? এই প্রশ্নের মুখে একবার আমাদের সংবিধানের দিকে চোখ ফেরানো যাক।
ভারতের সংবিধানে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা ১৯ নম্বর ধারায়, বিশেষ করে ১৯(১) উপ-ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯ নম্বর ধারার অধীনে নাগরিকদের যে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো দেওয়া হয়েছে, তা এরকম- ১৯(১)(এ)-তে বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। ১৯(১)(বি)-তে শান্তিপূর্ণভাবে ও অস্ত্রহীনভাবে একত্রিত হওয়ার বা সভার অধিকার। ১৯(১)(সি)-তে সংগঠন, ইউনিয়ন বা সমবায় সমিতি গঠনের অধিকার।
তবে এই অধিকারগুলো মোটেই অবারিত নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা সততা রক্ষার্থে সংবিধানের ১৯(২) থেকে ১৯(৬) ধারায় এসব অধিকারের ওপর যুক্তিসঙ্গত বা ন্যায্য বিধিনিষেধ আরোপ করার ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছে। ১৯ নম্বর ধারার অধীনে নাগরিকদের মৌলিক স্বাধীনতা দেওয়া হলেও, দেশের একতা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে রাষ্ট্রকে কিছু যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। ১৯(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রকে বিধিনিষেধ আরোপ করার যে সব ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা হল- এক, ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করতে। দুই, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিপন্ন হলে। তিন, বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে। চার, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে। পাঁচ, শালীনতা বা নৈতিকতা ক্ষুণ্ণ হলে। পাঁচ, আদালতের অবমাননা করা হলে। ছয়, মানহানি ঘটলে। সাত, কোনো অপরাধে প্ররোচনা বা উস্কানি দিলে।
এমন কি, অনুচ্ছেদ ১৯(৩)-এ শান্তিপূর্ণভাবে একত্রিত হওয়ার অধিকারের ওপরও রাষ্ট্রকে বিধিনিষেধ আরোপ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৯(১)(বি) অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ ও অস্ত্রহীন সভার অধিকার দেওয়া হলেও দুটি কারণে রাষ্ট্র এতে বাধা দিতে পারে। এক, ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করতে। দুই, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে। অনুচ্ছেদ ১৯(৪)-এ সংগঠন বা সমিতি গঠনের অধিকারের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে, যদি তাতে ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা বিঘ্নিত হয়, জনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হয় এবং নৈতিকতা বাধা পায়, যেভাবে কোনো অপরাধমূলক বা সন্ত্রাসী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে পারে রাষ্ট্র।
উদাহরণস্বরূপ দেশের সুপ্রিম কোর্টের কিছু ঐতিহাসিক মামলার কথা বলা যেতে পারে। ১৯৫০ সালে রমেশ থাপার বনাম মাদ্রাজ রাজ্য-র মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, ১৯(১)(এ) ধারার বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে সংবাদপত্রের প্রচার ও সার্কুলেশনের স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত। আদালত স্পষ্ট করে যে, ১৯(২) ধারায় উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া সরকার কোনো সংবাদপত্রের ওপর আগাম নিষেধাজ্ঞা বা সেন্সরশিপ জারি করতে পারে না।
১৯৬৩ সালে ও. কে. ঘোষ বনাম ই. এক্স. জোসেফ মামলায় মামলায় আদালত ১৯(২) থেকে ১৯(৪) উপ-ধারায় ব্যবহৃত “জনস্বার্থে” শব্দবন্ধটির ব্যাখ্যা দেয়। আদালত জানায় যে, সরকারের আরোপিত বিধিনিষেধ এবং জনশৃঙ্খলার ঝুঁকির মধ্যে সরাসরি ও বাস্তব সংযোগ থাকতে হবে, কোনো কাল্পনিক কারণে অধিকার খর্ব করা যাবে না।
১৯৭১ সালে কে. এ. আব্বাস বনাম ভারত সরকারের মামলায় সিনেমার ওপর সেন্সরশিপ বা প্রি-সেন্সরশিপের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, চলচ্চিত্র সাধারণ আর্ট বা বইয়ের চেয়ে মানুষের মনে অনেক বেশি গভীর প্রভাব ফেলে। তাই জনস্বার্থে ও নৈতিকতা বজায় রাখতে চলচ্চিত্রের ওপর সেন্সরশিপ ১৯(২) ধারার অধীনে একটি যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ।
২০১২ সালে আরও একটি মামলার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তা হল- রামলীলা ময়দান ঘটনা বনাম স্বরাষ্ট্র সচিব। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার ও রাষ্ট্রের বিধিনিষেধের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা করে। আদালত জানায় যে, মৌলিক অধিকারের ওপর যেকোনো নিষেধাজ্ঞা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত ও প্রয়োজনীয় হতে হবে এবং তা কোনোভাবেই ১৯(২) ধারার নির্ধারিত সীমার বাইরে যাওয়া যাবে না।
২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায় দেয়। মামলাটি ছিল শ্রেয়া সিংঘাল বনাম ভারত সরকার। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৬৬এ (66A) ধারা বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট এই ঐতিহাসিক রায় দেয়। আদালত জানায়, ইন্টারনেটে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করা ১৯(১)(এ) ধারার মৌলিক অধিকার। সরকারের অস্পষ্ট বা অতিরিক্ত কঠোর কোনো আইনি বিধিনিষেধ ১৯(২) ধারার আওতাভুক্ত হতে পারে না।
২০২০ সালে অনুরাধা ভাসিন বনাম ভারত সরকারের মামলায় উঠে আসে জম্মু-কাশ্মীরে ইন্টারনেট পরিষেবা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার প্রসঙ্গ। ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য বা পেশা চালানো ১৯(১)(জি) ধারা এবং মত প্রকাশ করা ১৯(১)(এ) ধারার অন্যতম মাধ্যম। তাই জাতীয় নিরাপত্তার নামে অনির্দিষ্টকালের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ রাখা ১৯(৬) ও ১৯(২) ধারার অধীনে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ নয়।