তাপস মহাপাত্র
এসআইআর চলাকালীন সমস্ত নির্দেশই তিন নির্বাচন কমিশনারের সর্বসম্মত সম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছিল এবং ভোটার তালিকাভুক্তির জন্য ‘ফর্ম ৬’-এ আনা পরিবর্তনগুলি সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছিল। দেশ জুড়ে এসআইআর ইস্যুতে প্রবল বিতর্কের আবহে শনিবার নির্বাচন কমিশন যৌথ ভাবে লিখিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই বিবৃতি দিল। ওই বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশন সম্মিলিত ভাবে দাবি করেছে, এসআইআর চলাকালীন সমস্ত নির্দেশই তিন নির্বাচন কমিশনারের সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছিল এবং ভোটার তালিকাভুক্তির জন্য ‘ফর্ম ৬’-এ আনা পরিবর্তনগুলি সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছিল। উল্লেখ্য, ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, এসআইআর চলাকালীন কমিশনের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জ্ঞানেশ কুমার বাদে ওই দুই নির্বাচন কমিশনার ১১ মাসে অন্তত ১৪টি ক্ষেত্রে আপত্তি জানিয়েছিলেন। বস্তুত, তাই নিয়ে এই মুহূর্তে জাতীয় রাজনীতি উত্তাল। তবে শনিবারের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী।
ওই বিজ্ঞপ্তিতে ভোটারদের ভোগান্তি কমাতে, সেইসঙ্গে কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা কিছু অভিযোগ খণ্ডন করতে এদিন নির্বাচন কমিশন একগুচ্ছ পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছে। তবে কমিশনের এই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়নি, কংগ্রেস ইতিমধ্যে সেগুলোর দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কমিশন ঘোষণা করেছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ, সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন এবং দিল্লি ও মহারাষ্ট্রের জন্য অতিরিক্ত সময় দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলা ও বিহারের মতো রাজ্যগুলিতে—যেখানে এসআইআর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে, সেখানেও ভোটার তালিকাভুক্তির বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশন এও ঘোষণা করেছে, বুথ লেভেল অফিসাররা এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং ‘ECINet’ নামক তাদের সমন্বিত পোর্টালে নথি আপলোড করবেন। বিশেষ করে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি করা হবে যাদের তথ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নেই বা যাদের তথ্যে যৌক্তিক অসঙ্গতি রয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া ইআরও বা এআরও অফিসে সশরীরে শুনানির আর প্রয়োজন নেই। বরং অনলাইন শুনানির ওপরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ভোটারের হয়ে তাঁর পরিবারের অনুমোদিত সদস্যরাও শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন। এইসঙ্গে কমিশন জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় অনলাইন শুনানির ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন জেলা নির্বাচন আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছে যে তাঁরা যেন প্রয়োজন অনুযায়ী নাইট শেল্টার বা রাত্রিবাসের কেন্দ্রে বসবাসকারী মানুষ, শ্রমিক, দরিদ্র ও গৃহহীনদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক সহায়তা কেন্দ্র খোলেন বা বিশেষ ক্যাম্পের আয়োজন করেন।
কমিশনের দাবি, গত কয়েক মাসে বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের পরামর্শ ও তথ্যের ভিত্তিতে পোর্টালে ইতিমধ্যেই নানা উন্নয়নমূলক পরিবর্তন আনা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের আধিকারিকদের যদি আরও নমনীয় ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়, তবে তাও কার্যকর করা হবে বলে কমিশন জানিয়েছে। দিল্লির ক্ষেত্রে, দাবি ও আপত্তি দাখিলের সময়সীমা ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের মতে, দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের অনুরোধের প্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, নোটিশ, দাবি ও আপত্তি নিষ্পত্তির সময়সীমাও ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
একইভাবে মহারাষ্ট্রে, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের অনুরোধে দাবি ও আপত্তি জানানোর সময়সীমা ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ১০ নভেম্বর পর্যন্ত এগুলোর নিষ্পত্তি করা যাবে। বিহার ও বাংলা-সহ যে ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর-এর কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। সেগুলোর ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন) জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়ার সময় বা পরে যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁরা ‘কন্টিনিউয়াস আপডেটেশন প্রসেস’-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকায় নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারেন।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তরুণ ও প্রথমবারের ভোটারদের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য। নির্বাচন প্যানেল সংশ্লিষ্ট মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছে এই প্রক্রিয়া সহজ করতে এবং এমন ভোটারদের তালিকাভুক্ত করার জন্য অবিলম্বে একটি বিশেষ অভিযান শুরু করতে। গোয়ায়, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বিএলও-দের নির্দেশ দিয়েছেন ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের বাড়ি গিয়ে তাদের ফর্ম সংগ্রহ করতে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এ পর্যন্ত চিহ্নিত ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে ৮১ জন ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ‘ফর্ম ৬’ জমা দিয়েছেন।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত তথ্যের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ক্যাবিনেট সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিটি ছিল- ডেপুটেশনে থাকা এক আধিকারিকের কাজকর্ম সংক্রান্ত—কোনো নীতি বা তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক নয়। কমিশন আরও জানিয়েছে, ওই আধিকারিকের কাজের পুনর্বণ্টন সংক্রান্ত নির্দেশ কখনও কার্যকর করা হয়নি এবং ডেপুটি ইলেকশন কমিশনারের হাতে থাকা তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের তদারকির দায়িত্বও প্রত্যাহার করা হয়নি।
কংগ্রেস নির্বাচন কমিশনের এই বিবৃতিকে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বলে অভিহিত করেছে। কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জয়রাম রমেশ কমিশনের প্রেস বিবৃতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, এতে প্রকাশিত খবরের বিষয়বস্তুকে সরাসরি অস্বীকার করা হয়নি। তাঁর কথায়, এই বিবৃতি থেকে বোঝা যায় যে গোয়ার ঘটনায় নির্বাচন কমিশন ধরা পড়ে গেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, অন্য রাজ্যের যেসব ভোটারের নাম জনৈক ব্যক্তির দুর্নীতির কারণে বাদ দেওয়া হয়েছিল, তারা কি কোনো জবাব পাওয়ার যোগ্য নন ? রমেশ বলেন, , ওই প্রেস নোটে প্রকাশিত তথ্যগুলোকে “খাটো করে দেখানোর একটি রক্ষণাত্মক চেষ্টা” করা হয়েছে, “কিন্তু অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন—এমন কথা বলা হয়নি। দ্বিতীয়ত, গোয়ার ক্ষেত্রে—বিষয়টি ধরা পড়ে যাওয়ার পর নির্বাচন কমিশন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই জানিয়েছে, তালিকা থেকে বাদ পড়া ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে ৮১ জনের ক্ষেত্রে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ‘ফর্ম ৬’ ইতিমধ্যেই পূরণ করা হয়েছে। সহজ কথায় বলতে গেলে, একটি ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটারদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হল, আর ধরা পড়ার পর বলছেন যে তাঁদের নাম আবার তালিকায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।”
রমেশ আরও বলেন,”এটি ২৭ মে, ২০২৬-এর সুপ্রিম কোর্টের আদেশের দোহাই দিয়ে কমিশনের কার্যকলাপকে যৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক তথ্য প্রকাশের অনেক আগেই ঘোষিত সেই আদেশটি সিইসি-কে কোনোভাবেই দায়মুক্তি দেবে না।এটি দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে ভোটার নিবন্ধনের সময়সীমা বাড়িয়েছে। কিন্তু কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার ভোটারদের কী হবে ? বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে ভোটাধিকার হারানো ভোটারদের কী হবে ? একজন ব্যক্তির দুর্নীতির কারণে যেসব রাজ্যের ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তারা কি কোনো জবাব পাওয়ার যোগ্য নয় ? তিনি আরও যে প্রশ্ন এনেছেন তাতে তিনি জানতে চেয়েছেন, প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ইসিআই এখন আইআইটি বা আইআইআইটি-র বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ‘ইসিআইনেট’ পোর্টালটি পর্যালোচনা করাবে এবং নিয়মকানুন মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে একটি প্রতিবেদন জমা দেবে। এটি একটি অর্থহীন সুরক্ষাব্যবস্থা,কারণ মূল উদ্বেগটি কারিগরি ত্রুটি নিয়ে নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে যা তৃণমূল পর্যায়ে নতুন ভোটার যুক্ত করতে বাধা দেয়। পাশাপাশি, এটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের উদ্বেগের বিষয়টিকেই নিশ্চিত করে।” এছাড়াও তিনি তুলে ধরেছেন, প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ‘জেন-জি’ ভোটারদের সুপরিকল্পিতভাবে টার্গেট করার বিষয়ে কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি। জুলাই ২০২৬-এর মাঝামাঝি সময়ে ‘ফর্ম ৬’-এ সম্পূর্ণ বেআইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল—যার ফলে তাদের ওপর বাবা-মা বা দাদা-দাদির বিস্তারিত তথ্য খুঁজে বের করার ও প্রকাশের অন্যায্য বোঝা চাপানো হয়েছিল—তার কোনো জবাব ইসিআই-এর কাছে নেই।