ওঙ্কার ডেস্ক : স্থানীয় মেলার চাঁদা সংগ্রহকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষের একদিন পর, রবিবার ত্রিপুরার উনাকোটি জেলার কুমারঘাট মহকুমায় পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ। যদিও তা নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করেছে ত্রিপুরা পুলিশ। আগরতলার একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, শনিবার পুলিশ উভয় সম্প্রদায়ের ১০ জনকে আটক করেছে।
তাঁরা আরও জানিয়েছেন, রবিবার পুলিশ ধৃতদের সাতজনকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় আদালতে হাজির করে পুলিশ হেফাজতের আবেদন করেছে। উত্তেজনা প্রবন এলাকায় আসাম রাইফেলস, ত্রিপুরা স্টেট রাইফেলস, সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স এবং রাজ্য পুলিশের বিশাল বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। উনাকোটি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রূপম চাকমা জানিয়েছেন, “ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে নিরাপত্তা বাহিনী নিয়মিত টহল দিচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। শনিবার রাত থেকে নতুন করে কোনও ঘটনা ঘটেনি,”
তিনি বলেন, কেউ যদি কোনও গুজব বা ভুয়া ছবি ও ভিডিও ছড়ায়, তাহলে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আরেক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, মিশ্র জনবহুল এলাকা এবং ধর্মীয় স্থানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় মেলার চাঁদা সংগ্রহকে কেন্দ্র করে দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষের পর শনিবার উনাকোটি জেলার কুমারঘাট মহকুমায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। যেখানে কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয়জন আহত হন এবং বেশ কিছু ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি পুড়ে যায়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কুমারঘাট মহকুমা জুড়ে ৪৮ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট পরিষেবাও স্থগিত রাখা হয়েছে।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে লেখা এক চিঠিতে উনাকোটি জেলার পুলিশ সুপার সকল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার অনুরোধ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সাম্প্রদায়িক হিংসার পর ফটিকরয় থানা এলাকায় হঠাৎ করে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। ওই চিঠিতে এসপি জানিয়েছেন, “মিথ্যা বার্তা যাতে না ছড়ায় তাই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সকল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা জরুরি।”
পুলিশের মতে, শনিবার ফটিকরয় থানা এলাকার সাইদারপাড়ে একদল যুবক কাঠ বোঝাই গাড়ি থামিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক মেলার জন্য চাঁদা দাবি করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। শিমুলতলা এলাকার একটি সংখ্যালঘু পরিবার চাঁদা দিতে অস্বীকৃ হলে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। এরপর একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতা জড়ো হয়ে একটি কাঠের দোকান সহ কয়েকটি বাড়ি, যানবাহন এবং সম্পত্তিতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং একটি উপাসনালয় ভাঙচুর করে।
এই খবর মিশ্র জনতা অধ্যুষিত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং উপাসনালয় সহ সম্পত্তির ক্ষতির ঘটনার পর, কুমারঘাটের সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট উত্তেজনা রোধে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা ২০২৩ এর ১৬৩ ধারা জারি করেছেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তমাল মজুমদার এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অতিরিক্ত বাহিনী নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ছুটে যান এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করেন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিস্তারিত মূল্যায়ন করছেন। পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী পতাকা মিছিল করেছে, যদিও এলাকার কিছু অংশে এখনও উত্তেজনা বর্তমান। পরিস্থিতির উপর প্রখর নজর রেখেছে প্রশাসন। ত্রিপুরা প্রশাসন থেকে জনসাধারণকে শান্তি বজায় রাখতে এবং গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আবেদন জানানো হয়েছে।
এদিকে, রাজ্য বিজেপি সভাপতি রাজীব ভট্টাচার্য, রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি আশিস কুমার সাহা এবং বিরোধী দলনেতা এবং সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক জিতেন্দ্র চৌধুরী পৃথকভাবে এই সহিংসতার নিন্দা করেছেন। একই সঙ্গে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। রবিবার রাজ্যের প্রবীন কংগ্রেস নেতা এবং প্রাক্তন মন্ত্রী বীরজিৎ সিনহা, উনাকোটি জেলা কংগ্রেস সভাপতি মোঃ বদরুজ্জামানের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন।
তবে, যখন তারা ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘু পরিবারের সঙ্গে কথা বলার এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন পুলিশ প্রশাসন তাদের বাধা দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস নেতারা দাবি করেছেন যে রবিবার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে সংহতি জানাতে যাওয়ার সময় কর্তৃপক্ষ তাদের বাধা দিয়েছে। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে, বীরজিৎ সিনহা। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, “যদি সহিংসতার শিকার সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে রাজ্যে গণতন্ত্র নামক কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। প্রশ্ন ওঠে যে প্রশাসন সত্যকে চাপা দিয়ে কার স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করছে।”
