ওঙ্কার ডেস্ক: বৃহস্পতিবার বুসানে চিন প্রেসিডেন্ট শি জনপিং-এর সঙ্গে বৈঠকের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষত ইরান এই সিদ্ধান্তকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করে বলেছে, ট্রাম্পের নির্দেশ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি এক বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ। তিন দশক পর ফের এই ধরনের পরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্তে গোটা বিশ্বে উদ্বেগের ছায়া নেমে এসেছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যান্য শক্তিশালী দেশ বিশেষত রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়া আগেই গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা চালাচ্ছে। সেই কারণেই আমেরিকাকেও প্রস্তুত থাকতে হবে, যাতে শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। তাঁর মতে, আমেরিকার নিরাপত্তা ও আধিপত্য বজায় রাখার জন্য এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তিনি পেন্টাগন অর্থাৎ মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার প্রক্রিয়া শুরু করতে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরমাণু শক্তির দ্রুত নবীকরনের পিছনের কারণ হিসাবে রাশিয়া, একথা মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। সম্প্রতি মস্কো নিজেদের পারমানবিক অস্ত্র বহন করার যানের সফল পরীক্ষা করেছে। এক সপ্তাহ আগে রাশিয়া বুরভেস্টনিক নামের এক পরমাণু ক্ষেপানাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। যার পর ট্রাম্প মস্কোর উপর ক্ষীপ্ত। ট্রাম্পের কথায় রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ থামানোর কোনো ইচ্ছেই নেই। অনেকে মনে করছেন, পরমাণু অস্ত্রের ক্ষেত্রে মাস্কোর এতো বাড়বাড়ন্তিই জেরেই নিজেদের দেশের পরমাণু শক্তি বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছে ট্রাম্প।
এই ঘোষণার পর ইরান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। তেহরানের বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানায়, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিপজ্জনক। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বিশ্ব এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন শান্তি ও সহযোগিতা সবচেয়ে প্রয়োজন। অথচ আমেরিকা যুদ্ধ ও ধ্বংসের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে।” ইরান মনে করছে, এই পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা চুক্তির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উল্লেখ্য, ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সংঘাতের নেপথ্যে কারণ ছিল পরমাণু শক্তির নিয়ন্ত্রণ। তেহরানকে একাধিক বার চাপ দিলেও তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো রকম চুক্তি করতে রাজি হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত কেবল মার্কিন প্রতিরক্ষা নীতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্যকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। বহু দেশই গত কয়েক দশক ধরে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার বিরোধিতা করে এসেছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ চুক্তি বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই মেনে চললেও, এখন ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত সেই প্রতিশ্রুতিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
আমেরিকার মধ্যেই ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। শান্তিপন্থী সংগঠনগুলি দাবি করেছে, এই সিদ্ধান্ত কেবল নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা উসকে দেবে। মার্কিন কংগ্রেসের একাধিক সদস্যও এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, “এটি কেবল ভয় প্রদর্শনের রাজনীতি, যা বিশ্বের জন্য অশুভ বার্তা বহন করছে।” বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ঘোষণার পেছনে আসন্ন মার্কিন নির্বাচনের রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট। ভোটের আগে তিনি আমেরিকার প্রতিরক্ষা ও শক্তিশালী অবস্থানকে তুলে ধরতে চাইছেন। বিদেশ নীতি ও সামরিক ক্ষমতার প্রদর্শন তাঁর প্রচারের অন্যতম কৌশল হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, ইরানের পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনও এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মস্কোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, “এটি এক নতুন পারমাণবিক উত্তেজনার সূচনা।” বেজিং-এর বক্তব্য, “যে কোনও দেশ যদি এই পথে এগোয়, তবে তার প্রতিক্রিয়া গোটা বিশ্বকে ভুগতে হবে।”
