ওঙ্কার ডেস্ক : উত্তরপ্রদেশের আমরোহা জেলার একটি মন্দিরে তিন মেয়ে একজনকেই বিয়ে করার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এই ব্যতিক্রমী বিয়ে নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে দেশ জুড়ে। ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ওই তিন কন্যে একমাত্র বরের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী হিন্দু বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান পালন করছেন। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি প্রথমে পবিত্র আগুনের চারপাশে সাতবার প্রদক্ষিণ করছেন এবং এরপর প্রত্যেক কনের সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিচ্ছেন।
ওই তিন নারীর পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন আমরোহা জেলার ধোরিয়া গ্রামের সরোজ, সাবিত্রী ও সন্তোষ। তাঁদের মধ্যে দুজন আপন বোন এবং তৃতীয়জন তাঁদের খুড়তুতো বোন। যদিও সোশ্যাল মিডিয়ার অনেক পোস্টে তাঁদের তিনজনকেই বোন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে বিকাশকে। জানা গেছে, তিনি ওই নারীদের সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্টের জন্য ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করতেন। গত ছয় মাস ধরে তিনি ভিডিওগুলোতে তাঁদের ‘অন-স্ক্রিন স্বামী’ বা পর্দায় স্বামী হিসেবে উপস্থিত হচ্ছিলেন।
শুরুতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের অনেকেই মনে করেছিলেন যে অনলাইন কন্টেন্ট তৈরির জন্য এই বিয়ের আয়োজনটি সাজানো বা নাটকীয় ছিল। তবে পরবর্তীতে তাঁরা চারজনই ক্যামেরার সামনে এসে বলেন, বিয়েটি বাস্তবিক, কোনো ‘রিলস’ তৈরির জন্য নয়।
ওই নারীরা জানিয়েছেন যে তাঁরা একসঙ্গে বেড়ে উঠেছেন এবং বিয়ের পরেও একে অপরের থেকে আলাদা হতে চাননি। তাঁরা দাবি করেন, তাঁদের পরিবার ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের সঙ্গে তাঁদের বিয়ের আয়োজন শুরু করেছিল, যাতে তাঁদের সম্মতি ছিল না। তাঁদের মতে, তাঁরা সবাই মিলে বিকাশকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন যাতে তাঁরা একটি পরিবার হিসেবে একসঙ্গে বসবাস চালিয়ে যেতে পারেন। তাঁরা আরও জানান যে তাঁরা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক এবং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের প্রতি তাঁদের অনুরোধ, যেন তাঁদের নিয়ে ট্রোলিং বা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা বন্ধ করা হয়।

ওই তিন মেয়ের একজনের বক্তব্য, “আমরা ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে আছি এবং আলাদা থাকার কথা কল্পনাও করতে পারি না। যখন আমরা বুঝতে পারলাম যে বিয়ে আমাদের আলাদা করে দিতে পারে, তখন আমরা এমনকি আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলাম। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, মরে যাওয়ার বদলে আমরা একসঙ্গেই থাকব এবং একজন পুরুষকেই বিয়ে করব। আমরা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক এবং স্বেচ্ছায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” জানা গেছে, সরোজ বি-টেক করছেন, আর সাবিত্রী ও সন্তোষের পড়াশোনা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত। বিকাশ জানান, তিনি এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলেন কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ওদের মধ্যে কতটা গভীর বন্ধন রয়েছে। তাই তিনি তাঁদের ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে চেয়েছিলেন।
ভিডিওগুলো হাসানপুরের মা চামুণ্ডা মন্দিরে তোলা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মন্দির কর্তৃপক্ষ এই কথিত বিয়ের বিষয়ে কোনো কিছু জানা নেই বলে দাবি করেছে। মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভিডিওগুলো তোলার সময় সেখানে সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছিল। তখন কোনো পুরোহিত বা মন্দিরের কর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁরা আরও জানিয়েছেন, মন্দিরের প্রাঙ্গণে এমন কোনো অনুষ্ঠান হওয়ার বিষয়ে তারা কিছুই জানতেন না।
অনলাইনে ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বেশ কয়েকটি হিন্দু সংগঠন এই কথিত বিয়ে এবং ভিডিওতে দেখানো ধর্মীয় রীতিনীতির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে অনেকেই জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যদি প্রাপ্তবয়স্ক হন এবং তাঁদের সবার সম্মতি থাকে, তবে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা তাঁদের থাকা উচিত। অনলাইনে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে ওই বোনেরা নিজেদের বিয়ের সপক্ষে আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করেন। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনির প্রসঙ্গ টেনে তাঁরা প্রশ্ন রাখেন, “প্রাচীনকালে রাজা দশরথের তিনজন রানি ছিলেন। সেটা কি কোনো অপমানজনক বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল?”

হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫ অনুযায়ী বহুবিবাহ নিষিদ্ধ। এই আইনের ৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, একটি বৈধ হিন্দু বিয়ে তখনই হতে পারে যখন বিয়ের সময় কোনো পক্ষেরই জীবিত জীবনসঙ্গী না থাকে। একজন হিন্দু পুরুষ আইনত একই সময়ে একাধিক নারীকে বিয়ে করতে পারেন না এবং প্রথম স্ত্রী বা স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হয়। এ ধরনের বিয়ের ক্ষেত্রে ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা-র ৮২ নম্বর ধারার (যা আগে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৪ নম্বর ধারা ছিল) অধীনে ফৌজদারি অপরাধের দায়ও তৈরি হতে পারে।