ওঙ্কার ডেস্ক: রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ না করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রোষের মুখে পড়েছে ভারত। চলতি মাসের শুরুতেই দুই দফায় মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর পর মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে। জানানো হয়েছে, বুধবার সকাল ৯টা ৩০ মিনিট (ভারতীয় সময়) থেকে আমেরিকায় রফতানি করা ভারতীয় পণ্যের উপর আরও অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে। ফলে প্রবল সমস্যায় পড়তে চলেছেন ভারতীয় রফতানিকারকেরা।
বাণিজ্য মন্ত্রকের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, শুল্কের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে এবং বিকল্প রফতানির বাজার খোঁজার বিষয়ে উৎসাহিত করবে সরকার। সম্ভাব্য বাজার হিসেবে চিন, দক্ষিণ আমেরিকা এবং পশ্চিম এশিয়ার নাম উঠে আসছে। রফতানি মহলের হিসেব অনুযায়ী, প্রায় ৮,৭০০ কোটি ডলারের পণ্যের ৫৫ শতাংশ রফতানি প্রভাবিত হতে পারে। ‘ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপোর্টস প্রমোশন কাউন্সিল’-এর সভাপতি পঙ্কজ চড্ডা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ইতিমধ্যেই মার্কিন ক্রেতারা নতুন অর্ডার দেওয়া বন্ধ করেছেন। সেপ্টেম্বরের পর থেকে রফতানি ২০-৩০ শতাংশ কমতে পারে। শুল্ক-বোমার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শেয়ার বাজারেও। সেনসেক্স ও নিফটি ১ শতাংশ কমেছে যা গত তিন মাসের মধ্যে একদিনে সর্বাধিক পতন।
বিশ্লেষকদের মতে, শুল্ক পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.৮ শতাংশ কমে যেতে পারে। আমেরিকার অভিযোগ, ভারত সস্তায় রাশিয়া থেকে তেল কিনে ফের বিক্রি করছে এবং সেই অর্থ রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় কাজে লাগছে। ট্রাম্প সরাসরি অভিযোগ করেছেন, ভারত কার্যত রাশিয়ার পাশে দাঁড়াচ্ছে। গত সপ্তাহে মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট মন্তব্য করেছিলেন, “ভারত সব সময় লাভ খোঁজে। সস্তায় তেল কিনে ফের বিক্রি করা এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা।”
যদিও ভারত সরকার এই অভিযোগ নিয়ে এখনও কোনও মন্তব্য করেনি। ভারত-আমেরিকার মধ্যে একাধিক দফায় আলোচনার পরও সমাধান আসেনি। মার্কিন পক্ষ পরিষ্কার করেছে শুল্ক সমস্যার মীমাংসা না হলে নতুন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব নয়। আমেরিকা চাইছে, ভারত কৃষিপণ্য ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার তাদের জন্য খুলে দিক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, ভারতীয় কৃষকের স্বার্থের সঙ্গে কোনওভাবেই আপস করা হবে না।
এর মধ্যেই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে এগিয়ে এসেছে চিন। বেজিং প্রথম থেকেই ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরোধিতা করে ভারতের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে। ফলে নয়াদিল্লি একদিকে আমেরিকার চাপ সামলাতে ব্যস্ত, অন্যদিকে চিনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের পথ খুঁজছে। মোদীর সম্ভাব্য চিন সফরকে অনেকেই সেই প্রক্রিয়ারই অংশ বলে মনে করছেন। সরকার ইতিমধ্যেই ৫০টি সম্ভাব্য দেশকে চিহ্নিত করেছে, যেখানে রফতানি বাজার সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। বিশেষ করে বস্ত্র, প্রসেসড ফুড, সামুদ্রিক পণ্য ও চামড়ার মতো খাতে নজর দেওয়া হচ্ছে।
রফতানিকারকদের আশঙ্কা, বিকল্প বাজার সহজে দাঁড় করানো সম্ভব হবে না। বাণিজ্য-রাজনৈতিক অচলাবস্থা যত বাড়ছে, ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের গভীরতা ও কৌশলগত স্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আপাতত দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে সম্পর্ক জোরদার রাখার আশ্বাস দিলেও, শুল্ক-সংকট কেটে না গেলে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন যে অব্যাহত থাকবে, তা স্পষ্ট।
