তাপস মহাপাত্র
বিহারের নির্বাচনী ফলাফলে বঙ্গ বিজেপি যে উজ্জীবিত তার প্রকাশ বারবার উঠে এসেছে বঙ্গ বিজেপির নেতাদের মধ্যে। এনডিএ-র বিপুল জয়ের পর বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী লাড্ডু বিতরণের মধ্য দিয়ে দলের কর্মীদের সামনে যে প্রত্যাশার ঢেউ তুলতে চয়েছিলেন, সেটাই এখন বিজেপির কাছে ২৬শের শক্তি হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যেই বঙ্গ বিজেপি শ্লোগান তুলেছে “অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ”। অর্থাৎ বলতে চাইছে, অঙ্গ ও কলিঙ্গ বিজেপির দখলে এসেছে। এবার বাকি বঙ্গ। আর এটা সফল করতে গিয়ে তাদের পাখির চোখ এসআইআর। কয়েকদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দলীয় কর্মী ও নেতাদের কাছে কার্যত হুশিয়ারি দিয়েছিলেন, এসআইআরকে অন্তত ৮০ শতাংশ সফল করতে হবে, তবেই তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরবর্তী পরিকল্পনা।
রাহুল গান্ধীর “ভোট চুরি” ইস্যুকে উড়িয়ে দিয়ে বিহার জয় জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপিকে মানসিক দিক থেকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। তাই এবার পূর্ণ দৃষ্টি পশ্চিমবঙ্গের দিকে। সর্বশক্তি দিয়ে তারা কেন্দ্রিভূত করতে চাইছে ‘লুক ইস্ট’। লক্ষ্য একটাই- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস। এবার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মাটি জয় করে নীতিগত দিক থেকে যে অতৃপ্তি ঘোঁচাতে চাইছে বিজেপি। দলীয় নেতৃত্ব মনে করছে, এটাই সুবর্ণ সুযোগ। অন্তত বঙ্গ বিজেপির রিপোর্টে ভর করে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বঙ্গ জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। ২১শের হতাশা কাটাতে ২৬শের যুদ্ধকে তারা সম্মানের লড়াই হিসেবে দেখছেন। যে কারণে ডিসেম্বর থেকে বাংলায় লাগাতার প্রচারে আসছেন মোদি-শা।
শুধু তাই নয়, বিজেপি এবার ভৌট কৌশলে লক্ষ্যের বিকেন্দ্রীকরণও নিচ্ছে। মূল লক্ষ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে না রেখে তারা দৃষ্টি দিতে চাইছে অভিষেকের বিরাকভাজন বা আনুগত্যহীন তৃণমূল কর্মীদের দিকে। দলের অভ্যন্তরে ভাঙন ধরিয়ে তৃণমূলের শক্তিকে খর্ব করার তোড়জোড় ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছে বঙ্গ বিজেপি। সোমবার অভিষেকের তড়িহড়ি ভার্চুয়াল মিটিং, ২৫ হাজার দলীয় কর্মী, নেতা, বিধায়ক, সাংসদদের আলস্য কাটানোর দাবাই এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
একই সঙ্গে রাজনীতিতে পরিবারতান্ত্রিকতাকেও সামনে আনতে চাইছে। বলাবাহুল্য, জাতীয় রাজনীতিতে গান্ধী পরিবারের বিরুদ্ধে যে অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে সেটা এবার ব্যানার্জী পরিবারের বিরুদ্ধে ছুঁড়তে চাইছে বিজেপি। এই কৌশল সম্পর্কে অবগত এক বিজেপি নেতা বলেছেন যে, ভোটারদের উপর মমতা যেভাবে ভাইপোকে ভবিষ্যতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রমোট করতে চাইছেন সেটা এবার সামনে আনছে তারা। উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভোটারদের উপর ভাইপোর আনুগত্য তাঁর পিসির মতো নয়……এই অস্ত্রে বিজেপি বাংলার ভোটারদের আঁতে ঘা দিতে চাইছে। বলাবাহুল্য ২০২১ সালে এই অস্ত্র তৃণমূল নেতাদের উপর প্রয়োগ করে অনেকটাই সফল হয়েছিল বিজেপি। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ শুভেন্দু অধিকারী। সবাই জানেন, শুভেন্দুর এই দলবদলের প্রধান কারণ ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেকের উত্থান মেনে নিতে পারেননি শুভেন্দু। বিজেপিতে যোগ দিয়ে তিনি অভিষেকের বিরুদ্ধে লাগাতার অস্ত্র শানিয়ে চলেছেন। যদিও বলা হচ্ছে ২৬শের নির্বাচনে দলত্যাগীদের দলে নেওয়ার কথা ভাবছে না বিজেপি। তারা বরং দলের মধ্যে দক্ষ ও তরুণ কর্মী বাড়াতে চাইছে। অবশ্য তরুণ ব্রিগেড গড়তে গিয়ে পুরোনো নেতাদের বিমুখ করতে চাইছেন না বঙ্গ বিজেপির এবারের কাণ্ডারী শমীক ভট্টাচার্য। প্রথম থেকেই তিনি নবীন ও প্রবীনের মধ্যে সামঞ্জস্য ও বোঝাপড়ায় গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন।
এক্ষেত্রে আরও একটি দিক বিজেপির হিসেবে উঠে আসছে। তা হল নীতীশ কুমারের ভোট-গণিত। বিহারের ২৪৩টি আসনের মধ্যে ২০০-রও বেশি এনডি-এতে আনার পিছনে তাঁর অঙ্ক ছিল বিভিন্ন প্রান্তিক সম্প্রদায় ও পিছিয়ে পড়া বর্ণের প্রার্থীদের একত্রিতকরণ। এই কৌশলকে মাথায় রেখে তৃণমূলের পক্ষে মুসলিম ভোটারের শক্তিকে যুঝতে চাইছে বিজেপি। বাংলায় মুসলিম ভোটার প্রায় ৩০ শতাংশ। কিন্তু এর প্রভাব রয়েছে খুব জোর ৩০-৪০টি আসনে। অর্থাৎ মোট আসনের ১৪ শতাংশও নয়। বিজেপির হিসেব বলছে, তৃণমূল মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা থেকে প্রচুর সংখ্যক ভোট পায়, কিন্তু যেহেতু এই ভোটগুলি এত কম আসনে কেন্দ্রীভূত, তাই এটি জয়ী আসনের গণনার উপর বাস্তবিক প্রভাব ফেলে না। তাই এদিকে বিশেষ নজর না দিয়ে তারা এখন চাইছে সম্ভাব্য শক্তিশালী কেন্দ্রগুলির দিকে নজর দিতে। সেই হিসেবে তাদের লক্ষ্য ১৬০ বা তার বেশি আসন। এমনিতেই উত্তর ও দক্ষিণ জেলাগুলিতে বিজেপি বিশেষভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, বিজেপির খন পর্যন্ত বাংলায় সেরা প্রদর্শন ছিল ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন। সেবার ১৮টি আসন জিতেছিল বিজেপি। ভোট পেয়েছিল ৪০.২৫ শতাংশ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তারা ৭৭টি আসন পায়। যদিও প্রাপ্ত ভোটের হিসেব কমে দাঁড়ায় ৩৮.১৪ শতাংশ। অন্যদিকে, তৃণমূল গত বিধানসভা ভোটে পেয়েছিল ৪৮ শতাংশের কম। অর্থাৎ হিসেব বলছে, ক্ষমতায় আসতে হলে বিজেপিকে বাড়াতে হবে ৬ শতাংশ ভোট। এসআইআরকে ভর করে তাই আশা রাখছে বিজেপি। যদিও খাতায় কলমে হিসেব এবং ভোটদানকে কখনোই সরল সমীকরণে রাখা যায় না। প্রত্যাশা যাই বলুক না কেন, চ্যালেঞ্জটা সহজ নয়।
