ওঙ্কার ডেস্ক: বর্ষা মানেই বাঙালির পাতে ইলিশের চাহিদা তুঙ্গে। কিন্তু বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় ছাড়া এই সুস্বাদু মাছের জোগান সীমিত থাকায় দামও থাকে নাগালের বাইরে। সেই পরিস্থিতি বদলাতেই পুকুরে ইলিশ চাষের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন কাকদ্বীপের বিজ্ঞানীরা। গবেষণার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে আশাবাদী গবেষক মহল। তাঁদের দাবি, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ভবিষ্যতে পুকুরেই ইলিশ চাষ বাস্তব রূপ নিতে পারে।
প্রায় এক দশক ধরে কাকদ্বীপে কেন্দ্রীয় নোনা জলজীব পালন অনুসন্ধান কেন্দ্রের (সিবা) বিজ্ঞানীরা এই প্রকল্পে কাজ করছেন। গবেষণার মূল লক্ষ্য হল, প্রাকৃতিক নদী বা মোহনার বাইরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ইলিশের জীবনচক্র সম্পূর্ণ করা এবং বাণিজ্যিকভাবে এই মাছের চাষ সম্ভব করে তোলা। ইতিমধ্যেই গবেষণার প্রথম পাঁচটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে চলছে ষষ্ঠ তথা শেষ পর্যায়ের গবেষণা, যেখানে কৃত্রিম পরিবেশে ইলিশের প্রজনন এবং ডিম থেকে পোনা উৎপাদনের বিষয়টি নিয়ে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
গবেষকদের মতে, এখনও পর্যন্ত প্রায় ৯৮২টি পুকুরে পরীক্ষামূলকভাবে ইলিশ প্রতিপালনের কাজ করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গিয়েছে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ইলিশের সফল প্রজনন নিশ্চিত করা। কারণ, ইলিশ একটি পরিযায়ী মাছ। স্বাভাবিকভাবে সমুদ্র থেকে নদীতে উঠে এসে ডিম পাড়ে। সেই স্বাভাবিক পরিবেশকে কৃত্রিমভাবে তৈরি করাই গবেষণার সবচেয়ে কঠিন ধাপ। এই পর্যায়ে সফলতা মিললেই পুকুরে ইলিশ চাষের স্বপ্ন অনেকটাই বাস্তবের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে সম্প্রতি কাকদ্বীপ গবেষণা কেন্দ্রে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি অত্যাধুনিক ‘স্যালিনিটি গ্রেডিয়েন্ট রিসার্কুলেটরি অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম (আরএএস)’ চালু করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জলের লবণাক্ততার মাত্রা প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে, যা ইলিশের বৃদ্ধি ও প্রজননের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীদের আশা, এই নতুন প্রযুক্তি গবেষণার গতি আরও বাড়াবে এবং কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে বড় ভূমিকা নেবে।
গবেষণা সম্পূর্ণ সফল হলে শুধু বছরভর বাজারে ইলিশের জোগানই বাড়বে না, দামও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। পাশাপাশি মৎস্যচাষীদের জন্য নতুন আয়ের পথ খুলে যাবে। নদী ও সমুদ্র থেকে অতিরিক্ত ইলিশ আহরণের প্রবণতাও কমবে, ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশে ইলিশ সংরক্ষণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পুকুরে ইলিশ চাষ সফল হলে তা পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশের মৎস্যচাষের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে অভিমত।