ওঙ্কার ডেস্ক : ফ্রান্সের জার্সিতে একইরকম উজ্জ্বল কিলিয়ান এমবাপে। অধিনায়ক এমবাপের দাপটে বোস্টনের মাঠে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে ফ্রান্স। কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এই একই ফলে মরক্কোকে হারিয়ে ফাইনালে গেছিল তারা।
এই নিয়ে পরপর তিনটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ রানার্স দিদিয়ের দেশঁর দল। ফ্রান্সের সামনে এখন পরপর তিনটি ফাইনাল খেলার হাতছানি। শুধু তাই নয়, মরক্কোর বিরুদ্ধে গোল করার সুবাদে বিশ্বকাপে এমবাপের মোট গোলের সংখ্যা এখন ২০। বিশ্বকাপে সবচেয়ে কমবয়সী ফুটবলার হিসেবে ২০টি ম্যাচ খেলে ২০ গোল করেছেন ২৬ বছর বয়সী এমবাপে। মেসির মোট গোলসংখ্যা এখন ২১। এখন দেখার বাকি ম্যাচগুলোয় মেসি নিজের গোল আর কত বাড়িয়ে নিতে পারেন। আর এমবাপে বাকি ম্যাচে মেসিকে ছুঁতে বা টপকে যেতে পারেন কিনা। চলতি বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইয়ে মেসির সঙ্গে সমান জায়গায় দাঁড়িয়ে এমবাপে ৮ গোল করে, তিনটি অ্যাসিস্টের কারণে। মরক্কো ম্যাচে ৬০ মিনিটে নিজে গোল করা ছাড়াও ৬৬ মিনিটে ডেম্বেলের করা গোলের পিছনেও তাঁর অবদান ছিল। চলতি বিশ্বকাপে ডেম্বেলের এটা ৫ নম্বর গোল। ২৮ মিনিটে এমবাপে পেনাল্টি মিস না করলে তাঁর ব্যক্তিগত গোলের সংখ্যা বাড়তে পারত।
তবে মরক্কোকে দাপটের সঙ্গে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছেও আত্মতুষ্টিতে ভুগছেন না এমবাপে। কারণ সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে খেলতে হবে বেলজিয়াম ও স্পেনের বিজয়ী দলের বিরুদ্ধে। যেটা মোটেই সহজ নয়। আরও একবার বিশ্বকাপ জেতার লক্ষ্যে ঝাঁপাতে তৈরি। আর তাই ম্যাচ শেষে এমবাপের প্রতিক্রিয়া, ‘ জয় চাপ অনেকটা কমিয়ে দেয় ঠিকই, তবে হাল্কা দেওয়ার কোনও অবকাশ নেই। যতক্ষণ না লক্ষ্যপূরণ হচ্ছে, ততক্ষণ সেরাটা দিয়ে যেতে হবে মাঠে। সেমিফাইনালে পৌঁছানোয় অবশ্যই খুশি। কিন্তু এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে।’
ফ্রান্স হল দ্বিতীয় দল, যাদের ২৪ বছর বাদে এমবাপে ও ডেম্বেলের মতো দুই ফুটবলারের ৫টি করে গোল আছে। এর আগে শেষবার এই কৃতিত্ব ছিল ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের। রোনাল্ডো ও রিভাল্ডো ৫টি করে গোল পেয়েছিলেন। মরক্কোর বিরুদ্ধে ম্যাচে প্রতিপক্ষের কড়া ট্যাকলে ৭৬ মিনিটে গোড়ালি চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়েন এমবাপে। এটা দেখে ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী কোচ দেশঁ আর এমবাপেকে মাঠে রাখার ঝুঁকি নেননি সেমিফাইনাল ম্যাচে কথা ভেবে। এক মিনিটে বাদেই এমবাপেকে তুলে নেন। তাঁর জায়গায় মাঠে নামেন জাঁ ফিলিপ-মাতেতা। ম্যাচ শেষে সতীর্থদের সঙ্গে মরক্কো জয়ের সেলিব্রেশন সেরে এমবাপে বলেন, ‘ আমার গোড়ালিকে আঘাত লেগেছিল। জোর করে খেলতে গেলে হিতে বিপরীত হত। ম্যাচ তখন আমাদের কব্জায় ছিল। তাই উঠে যাই। আমি ঠিক আছি। ওই সময় আমার থেকে ফিট মাতেতা নেমে মরক্কো ডিফেন্সকে চাপে রেখেছিল। কোচ দেশঁ ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।’ কোচ দেশঁর প্রতি কতটা শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও আস্থা আছে এমবাপের, সেটা বোঝা গেছে ম্যাচ শেষে পরস্পরকে উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ হতে দেখে।
মরক্কোর বিরুদ্ধে দলের জয় ও এমবাপের পারফরমেন্সের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা কোচ দেশঁর মুখে। বলেন, ‘ আমরা কতটা ধারাবাহিকভাবে ভাল খেলেছি, সেমিফাইনালে ওঠাটাই তার প্রমাণ। দলে ভাল ফুটবলার থাকলেই শুধু হয় না, দলগত সংহতি ও প্রচেষ্টাও সমান জরুরি। ফুটবলারদের কৃতিত্ব দিতেই হবে তাদের সেরা দেওয়ার জন্য। আমিও হয়ত ওদের ঠিকঠাক পরিচালনা করতে পেরেছি এখনও পর্যন্ত। আর এমবাপের সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। ও দলের অধিনায়ক। ওর মানসিকতা প্রসংশনীয়। পেনাল্টিতে গোল না পেলেও ওর ফোকাস নষ্ট হয়নি। বরং গোল না পাওয়া পর্যন্ত মরক্কো ডিফেন্সকে চাপে রেখেছিল। অনেকে বলেন এমবাপে নাকি নিজের জন্য খেলে। কিন্তু আমি মনে করি, যা করে তা দলের জন্যি। ও নিজেই একটা দৃষ্টান্ত সকলের কাছে। এখনও ওর কাছে আরও গোল প্রত্যাশা করি। সঙ্গে বিশ্বকাপ ট্রফিটাও। আরও একবার আমার কোচিংয়ে।’
সব ঠিকঠাক চললে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। মুখোমুখি হতে পারে আবার ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনা। তখন লড়াইটা জমবে। কারণ মেসি চাইবেন পরপর দু’বার বিশ্বকাপ জয়ে বিরল কৃতিত্ব অর্জনের, যা কিংবদন্তী মারাদোনাও পারেননি। আর এমবাপের লক্ষ্য হবে গত বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হারের জ্বালা জুড়োতে।মরক্কোর বিরুদ্ধে পুরো ৯০ মিনিট খেলতে পারেননি এমবাপে। নির্ধারিত সময়ের ১৩ মিনিট বাকি থাকতেই তাঁকে তুলে নিয়ে জাঁ ফিলিপে মাতেতাকে নামান দেশঁ। গোড়ালিতে চোট পেয়েছেন এমবাপে। কয়েক বার গোড়ালি ধরে মাঠে বসে পড়লেও খেলা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যদিও ফ্রান্স কোচ সেমিফাইনালের আগে ঝুঁকি নিতে চাননি। এমবাপের চোট নিয়ে ফ্রান্স শিবির থেকে সরকারি ভাবে কিছু জানানো হয়নি। পরে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘‘আমি ঠিক আছি। গোড়ালিতে একটু লেগেছে। এমনি ঠিকই আছে। আর মাতেতা শেষ ১৫ মিনিট আমার চেয়ে বেশি কার্যকর। তাই ওকে নামানো হয়েছিল।’’ ম্যাচের পর দর্শকদের অভিবাদনও গ্রহণ করেন হাসিমুখে।
এমবাপে স্বাভাবিক থাকলেও তাঁর পেনাল্টি নষ্ট হওয়ায় খুশি নন দেশঁ। ২৫ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি পায় ফ্রান্স। এমবাপে অনেকটা দৌড়ে মরক্কোর বক্সে ঢুকে পড়েন। সেখানে তাঁকে ফাউল করেন নৌসের মাজরাউই। এতটাই স্পষ্ট ছিল সেই ফাউল যে রেফারির সিদ্ধান্তে মাজরাউই নিজেই বিশেষ প্রতিবাদ জানাননি। অথচ সেই পেনাল্টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেই সময় লাগল তিন মিনিট ১০ সেকেন্ড। ভার-এর রেফারিদের রিপ্লে দেখা যেন শেষই হচ্ছিল না। অবশেষে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। সম্ভবত এতটা বেশি সময় লাগার কারণেই মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটেছিল এমবাপের। জীবনের সবচেয়ে খারাপ পেনাল্টিটা মারেন তিনি। মরক্কোর গোলরক্ষক বোনো এমনিতেই পেনাল্টি বাঁচানোর ব্যাপারে দক্ষ। তাঁর বাঁ দিকে এমবাপের নিচু শট এতটাই ধীরগতির ছিল যে বোনোর হাত থেকে বল বেরিয়ে পর্যন্ত যায়নি। সরাসরি তাঁর হাতে জমা পড়ে।

এমবাপের এমন পেনাল্টি নিয়ে ম্যাচের পর দেশঁ বলেছেন, ‘‘এমবাপে পেনাল্টি মারার আগে রিভিউয়ের জন্য ২ মিনিটের বেশি সময় নষ্ট হয়। এমবাপে তৈরিই ছিল। কাউকে দোষ দিতে চাই না। এমন পরিস্থিতিতে পেনাল্টি মারা সহজ নয়। এটা কোনও অজুহাত নয়।’’ এমবাপে নিজে বলেছেন, ‘‘আরাম করার একটাই উপায়। তা হল ম্যাচ জেতা। আমরা হাল ছাড়ার পাত্র নই। সেমিফাইনালে উঠে অবশ্যই ভাল লাগছে। তবে এখনও অনেক পথ বাকি।’’