অর্ণব দত্ত
বাঙালি যুবক-যুবতীরা এককালে অভিভাবকদের ভয়ে প্রেম করেছে লুকিয়ে। বর্তমানে সেই ধারা লুপ্ত। সঙ্গীতকার লিখেছিলেন, “প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে।“ সত্যিই তো প্রেম কোলাহলের বস্তু নয়, নীরবতা প্রেমের অন্যতম লক্ষণ।
বর্তমানে ভারতে জেন জি-এর সংখ্যা ৪০৬০ লক্ষ। ২০২৭ সালে সেনসাস রিপোর্ট প্রকাশিত হলেই সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের হাতে আসবে। তবে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ভারতের বাসিন্দা ৮৭ শতাংশ জেন জি প্রেমঘটিত জটিলতায় মানসিক সমস্যার শিকার। সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, আবার সেই সম্পর্কে মতবিরোধের ফলে প্রেমপর্বের সমাপ্তিতে জেন জিরা একের পর এক ব্রেক আপের শিকার।
এক্ষেত্রে ব্রেক আপ শব্দটি আমদানি হয়েছে কবে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সর্বশেষ জনগণনার রিপোর্ট অনুসারে, ভারতের মোট জনসংখ্যার ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ জেন জি প্রজন্মের অন্তর্গত। ২০২৭-এর সেনসাস রিপোর্টে এসম্পর্কে সঠিক পরিসংখ্যান জানা যাবে।
ভারতীয় সংস্কৃতিতে প্রেমকে সাধনারস্তরে উন্নীত করেছেন বহু মানুষ। নতুন প্রজন্ম কি সেখবর রাখে ? যেমন, হোয়াটস অ্যাপের জমানায় প্রেমপত্রর বিকল্প এখন মেসেজ। আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় নানা সংস্থার সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, প্রতি তিনজন ভারতীয় জেন জিদের মধ্যে একজন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। কারণ সেই ব্রেক আপের মহামারি।
জেন জি প্রজন্ম ১৪ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। আসলে জেন জি প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ভালোবাসার সম্পর্ক ভাঙার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এযুগে ছেলে এবং মেয়ের সমানাধিকার স্বীকৃত একটি বিষয়। ব্রিটিশ আমলে নারীশিক্ষা চালু হওয়ার পরে ধীরে ধীরে মেয়েরা তাঁদের মেধা প্রমাণ করতে শুরু করে। যে নারীকে মনুবাদী সংস্কৃতি নরকস্য দ্বার বলে অবহেলা করেছে, সেই নারী জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চায় বহুক্ষেত্রে পুরুষের তুলনা সমাজে অবদান সৃষ্টি করেছে।
প্রাচীন ভারতে গার্গী, মৈত্রেয়ী-সহ একাধিক নারী বিদুযী নারী হিসেবে সামাজিক মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। সেসব বহু অতীতকালের কথা। ব্রিটিশ আমলের একটি ঘটনা দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে, যা স্বাধীনতার ৮০ বছর পরে অধিকাংশ ভারতবাসী জানেন না। মাত্র ১১ বছর বয়সে এক ভারতীয় নারীর বিয়ে হয়েছিল ১৯ বছরের এক অশিক্ষিত পুরুষের সঙ্গে। তিনি বিয়ের পরে লেখাপড়া করতে প্রবলভাবে ইচ্ছাপ্রকাশ করলেও তাঁর স্বামীর এব্যাপারে তীব্র আপত্তি ছিল।
ওই স্বামীর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। এরপর ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়ায়|। এদিকে আদালত নির্দেশ দেয় স্বামীর পক্ষে। বিচারকরা বলেন, ওই নারীকে স্বামীর শয্যাসঙ্গিনী হিসেবেই জীবন কাটাতে হবে। অন্যথায় জেলে যেতে হবে। প্রতিবাদী মেয়েটি বিচারকদের মুখের উপর সাফ জানান, তিনি জেলে যেতে রাজি। স্বামীর শয্যাসঙ্গিনী হয়ে অমূল্য মানবীজীবন কাটাতে পারবেন না।
ঘটনার খবর কুইন ভিক্টোরিয়ার কানে পৌঁছয়। কুইন ভিক্টোরিয়া বিবাহ বিচ্ছেদ অনুমোদিত করেন। ইতিবাচক ঘটনা হল মেয়েটির বাবা চেয়েছিলেন মেয়ে নিজের ইচ্ছানুসারে শিক্ষিত হোক। এরপর তিনি ডাক্তারি পড়ে প্রথম ভারতীয় চিকিৎসকের শিরোপা অর্জন করে দৃষ্টান্ত তৈরি করেন। তাঁর নাম রুকমাবাঈ। তিনিই প্রথম ভারতীয় মহিলা চিকিৎসক।
ফলে্ ব্রেক আপ জিনিসটি পরাধীন ভারতেও ছিল কুইন ভিক্টোরিয়ার সৌজন্যে রুকমাবাঈ তাঁর যে সাহসিকতার স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন, তা স্বাধীন, ভারতে অবহেলিত, বঞ্চিত বহু নারীকে প্রেরণা জোগাবে। এদিকে ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে ওঁর কথা অনুচ্চারিত। ১৯৬৪ সালে জন্ম রুকমাবাঈয়ের মৃত্যু হয় ১৯৫৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।
কবি লিখেছিলেন, “মেলাবেন তিনি মেলাবেন।“ শ্রীকৃষ্ণও অর্জুনকেও বিষাদকাটিয়ে কৌরবদের বধ করতে বলেছিলেন। অর্জুন বিষাদগ্রস্ত হয়েছিলেন প্রধানত তিনি ভেবেছিলেন, ছেলেবেলা থেকে যাঁদের সঙ্গে কাটিয়েছেন তাঁদের বধ করা ধর্মসঙ্গত নয়। এই মোহ যদিও তার ভগবান শ্রীকৃষ্ণর উপদেশে কেটে যায়।
জেন জি প্রজন্মের প্রেমিক-প্রেমিকাদের একাংশের মতবিরোধের কারণ কী, তা নিয়ে বিস্তারিত চর্চা খানিকটা হয়েছে এবং আগামী দিনেও হবে। অন্যতম প্রধান কারণ পরস্পরের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব। ডিজিটাল দুনিয়ায় জেন জি প্রজন্মের মধ্যে যে ধৈর্য্যের অভাব দেখা দিচ্ছে, তাও উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি সামলানোর দায় অবশ্যই প্রবীণ এবং বিচক্ষণ নাগরিকদের। আসলে শিক্ষা শুরু হয় বাড়ির ভিতরেই। স্কুলকলেজ নিমিত্ত মাত্র।