ওঙ্কার ডেস্ক : সোমবার দিল্লির সুপ্রিম কোর্টে শুনানি চলাকালীন আচমকা রাকেশ কিশোর নামে এক প্রবীণ আইনজীবী জুতো ছুঁড়ে দেন প্রধান বিচারপতি বি. আর. গাভাইয়ের দিকে। যদিও জুতোটি বিচারপতির বেঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছোয়নি, তবুও আদালতের ভিতরে মুহূর্তের মধ্যেই চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা কর্মীরা দ্রুত ওই আইনজীবীকে আটক করেন। পরে তাঁর পরিচয় জানা যায় তিনি রাকেশ কিশোর, দিল্লি বার কাউন্সিলের নিবন্ধিত এক প্রবীণ আইনজীবী।
ঘটনার পর প্রধান বিচারপতি গাভাই সংযম বজায় রেখে উপস্থিত আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘‘মনোযোগ হারাবেন না, শান্ত থাকুন, শুনানি চলুক”। তাঁর এই সংযত প্রতিক্রিয়া আদালত চত্বরে উপস্থিত প্রত্যেকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। অপরদিকে, দিল্লি বার কাউন্সিল দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে রাকেশ কিশোরের আইনজীবী হিসেবে কাজের অনুমতি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে এবং তাঁকে ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধান বিচারপতিকে ফোন করে তাঁর প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন ও ঘটনাটিকে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানান। মোদি বলেন, ‘‘এ ধরনের আচরণ আমাদের সমাজে কোনও স্থান পায় না। দেশের প্রতিটি নাগরিক এই ঘটনার জন্য ক্ষুব্ধ। বিচারব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।’’ প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, প্রশাসন এই ঘটনার সম্পূর্ণ তদন্ত করবে এবং দোষীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইন মহলে এই ঘটনাকে বিচারব্যবস্থার প্রতি সরাসরি আক্রমণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বহু আইনজীবী ও প্রাক্তন বিচারপতি এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, আদালত হলো ন্যায় ও শৃঙ্খলার প্রতীক এখানে এমন অসংযমী আচরণ কোনওভাবেই বরদাস্তযোগ্য নয়। এদিকে, প্রধান বিচারপতি গাভাই সম্প্রতি খাজুরাহোর একটি বিষ্ণু মূর্তি পুনঃস্থাপন সংক্রান্ত মামলায় মন্তব্য করেছিলেন যে, এই ধরনের জনস্বার্থ মামলা প্রায়শই প্রচার পাওয়ার উদ্দেশ্যেই করা হয়, যা নিয়ে কিছু মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। আর এর জেরেই ক্ষোভেই রাকেশ কিশোর বিচারপতির উদ্দেশ্যে জুতো মারেন।
ঘটনা ঘটার পর মূল অভিযুক্ত রাকেশ কিশোর এক সংবাদ সংস্থাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বলেন, “বিচারপতি গাভাই সনাতন ধর্মকে নিয়ে মজা করেছেন”। তিনি চিফ জাস্টিস গাভাই এর উপর এই ক্ষোভের কারণ হিসাবে বলেন, চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ খাতে মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার বিষয় বস্তু এক মন্দিরকে কেন্দ্র করে। অভিযুক্ত রাকেশ কিশোরের মতে চিফ জাস্টিস সেই মামলাকারীকে নিয়ে মজা করেন যা অতপ্রতভাবে হিন্দু ধর্মেরও অপমান করছে। কিশোরের কথায়, “গাভাই বলছেন, আপনার ভগবান নিজের মাথা নিজে ঠিক করে নিতে পারবেন। একজন আইনের এত উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার কাছেন এমন মন্তব্য আশা করা যায় না”। তিনি গাভাইএর বি্রুদ্ধে সুর চরিয়ে আরও বলেন, “উনি কিন্তু বাকি ধর্মের প্রতি এমন মন্তব্য করেন না”।
বিচারপতি গাভাইএর দলিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাকেশ কিশোর বলেন, “উনি দলিত এটা উদ্বেগের কারন নয়। আগে চিফ জাস্টিস সনাতনী ছিলেন। পরে তিনি নিজের ধর্ম পরিবর্তন করে বৌদ্ধ ধর্ম অনুসরন করেন”। তিনি আরও বলেন, “উনি ভাবছেন সনাতন ধর্ম থেকে সড়ে গিয়ে অপমান করতে পারেন। এটা ওনার মানসিক অবস্থার পরিচয় দেয়”।
ভরা আদালতে চিফ জাস্টিসকে সর্বসমক্ষে জুতো মারার পর তৎক্ষনাৎ রাকেশ কিশোরকে আটক করা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। একথা কিশোর নিজেই জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমায় কিছু অফিসার নিয়ে গেলেও আমার বিরিদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি”। তিনি আরও জানান তাঁকে সেখানে দুইবার চা এবং একবার খাবারও দেওয়া হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে কোনোরকম খারাপ ব্যবহার করা হয়নি। আপাতত রাকেশ কিশোরকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। উনি এখন কোনো কোর্টে প্র্যাকটিস করতে পারবেন না।
তবে আদালতের ভিতরে তাঁর উপর আক্রমণের প্রচেষ্টা দেশের গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থার প্রতি এক বড় আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের সর্বোচ্চ বিচারপতির প্রতি এমন আচরণ গোটা বিচারব্যবস্থার মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, এবং সমাজজুড়ে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
