ওঙ্কার ডেস্ক: অস্ট্রেলিয়ার বন্ডি বিচ এলাকায় ভয়াবহ গুলিবর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে আতঙ্ক ও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। ব্যস্ত পর্যটন এলাকায় আচমকা এই হামলায় অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। হামলায় মারা গেছেন বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ১০ বছরের বাচ্ছাও। প্রকাশ্য দিবালোকে এমন আততায়ী হামলায় নড়েচড়ে বসেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। তাই এবার দেশের আগ্নেয়াস্ত্র সংক্রান্ত নিয়মে বদল আনার আর্জি পেশ করা হয়েছে। সিডনি পুলিশ জানিয়েছে এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে পাকিস্তানি বংশদ্ভুত বাবা-ছেলে। ঠিক কি কারণে এই হামলা তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
রবিবার সিডনির বন্ডি বিচে ইহুদীদের ধর্মীয় প্রাচীন উৎসব ‘হানুক্কাহ’ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। সেই অনুষ্ঠানে সব বয়সের প্রায় ১০০০-এর বেশি মানুষ যোগ দিতে এসেছিলেন। তারপর হঠাৎই দুইজন বন্দুকধারী গুলি চালাতে চালাতে অনুষ্ঠান মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে দুই বাবা ছেলে। বাচ্ছা, বৃদ্ধ, মহিলা কাউকে রেয়াত না করে গুলি চালাতে শুরু করে তারা। হামলাকারীর গুলিতে মৃত্যু হয় ১৫ জনের, আহত হয় ৪০ জনেরও বেশি। হামলার খবর পেয়ে সিডনি পুলিশ সেখানে পৌঁছালে পুলিশের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে মৃত্যু হয় একজন হামলাকারীর এবং অপরজন আহত অবস্থায় পুলিশের কাছে ধরা পরে। হামলাকারীর গুলিতে গুরতর আহত হন এক পুলিশকর্মীও। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, মুহূর্তের মধ্যে আনন্দমুখর পরিবেশ বদলে যায় বিভীষিকায়। গুলির শব্দে মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেন, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং গোটা এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
তদন্তে জানা গিয়েছে, এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে সাজিদ আক্রম ও তাঁর ছেলে নাভিদ আক্রম। বাবা-ছেলের এই জুটি পরিকল্পিতভাবেই জনসমাগমপূর্ণ এলাকাকে নিশানা করেছিল বলে তদন্তকারীদের অনুমান। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, তারা দীর্ঘদিন ধরেই চরমপন্থী ইসলাম মানসিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং সমাজের প্রতি তীব্র ক্ষোভ থেকেই এই হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। হামলাকারীদের গাড়ি থেকে আইএস-এর পতাকা উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাদের গতিবিধি, পারিবারিক পটভূমি ও যোগাযোগের পরিধি খতিয়ে দেখছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। হামলার সময় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র কীভাবে তাদের হাতে পৌঁছল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। হামলাকারীদের নিষ্ক্রিয় করা হলেও ততক্ষণে বহু নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানানো হয়েছে। গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে শুরু হয় তল্লাশি অভিযান, যাতে হামলার সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি না, তা নিশ্চিত করা যায়।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, বন্ডি বিচের হামলা দেশের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগ্নেয়াস্ত্র সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করার পথে হাঁটবে সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্দুক সহিংসতার বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান বরাবরই কঠোর, এবং এই ঘটনার পর সেই অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। প্রয়োজনে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের নিয়মে অতিরিক্ত কড়াকড়ি আনা হবে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিরোধী দলগুলি সরকারের প্রস্তাবিত কঠোর পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে, পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ ও উদ্বেগ স্পষ্ট। অনেকেই মনে করছেন, এত কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এমন ভয়াবহ হামলা সম্ভব হল, তার জবাব দেওয়া জরুরি।
