
আ. ফ. ম. বাহাউদ্দিন নাছিম
২৫ মার্চ, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ, বিভীষিকাময় দিন। ৫৪ বছর আগে ১৯৭১ সালের এইদিন মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। সেই থেকে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ হৃদয়ে ধারণ করে আসছে। সেদিন ঢাকার রাজপথ থেকে গ্রামগঞ্জ- সবখানেই রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল আমাদের মাতৃভূমি। ঘুমন্ত মানুষকে গুলি করে হত্যা, শিক্ষার্থীদের উপর বর্বর হামলা, নিরীহ পরিবারগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া- সব মিলিয়ে এটি ছিল এক জাতিকে মুছে ফেলার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দীর্ঘ ২১ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির তোষণকানীরা। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে দিতে স্বাধীনতা বিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করে। তবে ২০১৭ সাল থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছে ২৫ মার্চ ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে। ২০১৭ সালের ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে এই দিবস পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়।
দুই.
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, দখলদার শীর্ষ জঙ্গি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় এই দিবসটিকে জাতীয় দিবসের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে দিতে এটা ছিল তার মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ। দখলদারদের এই সিদ্ধান্তে জাতির হৃদয়ে নতুন করে আঘাত হানে। প্রশ্ন উঠে, ইতিহাস কি কখনো মুছে ফেলা যায়? একটি জাতির বেদনা, ত্যাগ আর রক্তস্নাত স্মৃতি কি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হারিয়ে যেতে পারে?
ভুলে গেলে চলবে না, ২৫ মার্চ শুধু একটি দিন নয়, এটি আমাদের চেতনা, আমাদের অস্তিত্বের অংশ। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতার মূল্য, শহীদদের ত্যাগ, এবং জাতি হিসেবে আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস। দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্মদিন কিংবা পাকিস্তান দিবস পালন করার মতো ঘটনা যদি কোথাও ঘটেছে-যা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয় এবং এর ভেতরে একাধিক রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংকেত লুকিয়ে থাকতে পারে।
প্রথমত, এটি হতে পারে ইতিহাস ও চেতনার এক ধরনের বিপরীতমুখী প্রবণতা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, যেখানে পাকিস্তানি শাসন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা বা রাষ্ট্রীয় দিবস উদযাপন করা আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দ্বিতীয়ত, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তাও হতে পারে। কিছু গোষ্ঠী হয়তো সচেতনভাবেই ইতিহাসের বয়ান বদলাতে বা বিভ্রান্তি ছড়াতে চায়। এর মাধ্যমে তারা মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে দুর্বল করার চেষ্টা করতে পারে- যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর। তৃতীয়ত, এটি আদর্শিক সংকটেরও ইঙ্গিত দেয়। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের মধ্যে যদি পরাজিত শক্তির প্রতি সহানুভূতি বা আকর্ষণ তৈরি হয়, তবে তা জাতীয় পরিচয় ও আত্মমর্যাদার জন্য অশনিসংকেত। আমি মনে করি, এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে, এর পেছনের উদ্দেশ্য ও প্রভাব বিশ্লেষণ করা জরুরি। ইতিহাসকে বিকৃত না করে, বরং সঠিকভাবে ধারণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা- এটাই হওয়া উচিত আমাদের মূল দায়িত্ব।
আরও দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবিদার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি। গত ২৩ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তান দিবস পালনের অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে এই দলটির মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখন কো্থায়? তাই এখন প্রশ্ন জেগেছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যা থেকে ২৪-এর জুলাই-আগস্টের অন্ধকার: ইতিহাস কি আবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে ?
তিন.
ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু তারিখ আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের দিন নয়- সেগুলো আমাদের জাতিসত্তার গভীরে খোদাই হয়ে থাকা ক্ষতচিহ্ন। তেমনই এক কালরাত্রি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যা- যে রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মানবতার সব সীমা লঙ্ঘন করেছিল। সেই রাতের অন্ধকারে রক্তে ভেসে গিয়েছিল ঢাকা, স্তব্ধ হয়েছিল মানুষের কণ্ঠ, আর শুরু হয়েছিল একটি জাতির মুক্তির সংগ্রাম। কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতা হলো- যদি আমরা তা থেকে শিক্ষা না নিই, তবে তা অন্য রূপে ফিরে আসে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশে যে সহিংসতা, হত্যা ও নৈরাজ্যের খবর সামনে এসেছে, তা অনেকের মনেই সেই কালো রাতের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে। প্রশ্ন জাগে- এই দুই সময়ের ঘটনার মধ্যে কি কোনো অদৃশ্য সুতো আছে?
১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ঢুকে ছাত্রদের হত্যা, বুদ্ধিজীবীদের নিধন, নিরীহ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি- সবই ছিল একটি সুপরিকল্পিত জাতিগত নিধনের অংশ। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই- বাঙালির আত্মপরিচয়কে চিরতরে মুছে ফেলা।
সেই সময় এদেশের কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহযোগী বাহিনী যেমন রাজাকার, আলবদর, আলশামস- তারা হানাদার বাহিনীর দোসর হয়ে উঠেছিল। তারা শুধু সহায়তাই করেনি, বরং বাঙালি নিধনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তারা দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।
আর ২০২৪ সালের পর যখন আমরা দেখি নানা নামে স্লোগানে কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী, যাদের মধ্যে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এবং বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নাম উঠে আসে, তখন সেই পুরনো ছায়াগুলো আবার যেন সামনে ভেসে ওঠে। সাম্প্রতিক সহিংসতায় যেভাবে নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছে, যেভাবে আতঙ্ক ছড়ানো হয়েছে- তা অনেকের কাছে পরিকল্পিত অস্থিরতা তৈরির প্রচেষ্টা বলেই মনে হয়েছে।
তাই প্রশ্ন- সবকিছু কি একই সূত্রে গাঁথা? ইতিহাসের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে যেমন একটি গোষ্ঠী বিদেশি শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল, তেমনি আজও কিছু গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে তাদের বিদেশি প্রভুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছে। উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু পদ্ধতিতে রয়েছে ভয়ঙ্কর মিল- আতঙ্ক সৃষ্টি, জনমনে বিভাজন তৈরি এবং রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করা। আবার পাকিস্তানি চেতনায় মিলিয়ে দেওয়া।
চার.
আমাদের সতর্ক থাকতে হবে- ইতিহাসের তুলনা করতে গিয়ে যেন আমরা বাস্তবতার জটিলতা ভুলে না যাই। ১৯৭১ সালের গণহত্যা ছিল একটি রাষ্ট্র পরিচালিত পরিকল্পিত জাতিগত নিধন। আর বর্তমান সময়ের সহিংসতা, যদিও নিন্দনীয় ও ভয়াবহ, তা একই মাত্রার নয়। তবে এর মধ্যে যে বিপজ্জনক প্রবণতা রয়েছে- তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আমাদের স্মৃতি। আমরা ভুলে যাইনি ২৫ মার্চের সেই রাত, আমরা ভুলে যাইনি মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ। সেই স্মৃতি আমাদের সতর্ক কর- যখনই কোনো শক্তি মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করতে চায়, যখনই সহিংসতা দিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা হয়, তখনই আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। বাংলাদেশ একটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়া দেশ। এখানে সহিংসতা, জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যারা এই পথ বেছে নেয়, তারা শুধু আইন ভঙ্গ করে না- তারা দেশের মূল চেতনাকেই আঘাত করে।
পাঁচ.
আজকের প্রজন্মের কাছে আমাদের দায়িত্ব- ইতিহাসকে সত্যভাবে তুলে ধরা। যেন তারা বুঝতে পারে, স্বাধীনতা কত বড় মূল্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে। যেন তারা কোনো প্রোপাগান্ডা বা বিভ্রান্তিতে পড়ে ভুল পথে না যায়। ইতিহাস আমাদের শেখায়- অন্ধকার যতই গভীর হোক, আলো ফিরে আসে। কিন্তু সেই আলো ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের সচেতন থাকতে হবে, ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, এবং সর্বোপরি- মানবতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
আজকের দিনে আমাদের দায়িত্ব ইতিহাসকে স্মরণ করা, নতুন প্রজন্মের কাছে সত্য তুলে ধরা এবং শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। কোনো সিদ্ধান্ত, কোনো ক্ষমতা যেন আমাদের ইতিহাসকে বিকৃত বা মুছে দিতে না পারে- এই হোক আজকের অঙ্গীকার। ২৫ মার্চের রক্তাক্ত স্মৃতি চিরজাগরুক থাকুক বাঙালির হৃদয়ে।
লেখক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক