
নয়ন বিশ্বাস রকি
২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা দিবস। একটি গৌরবময় অর্জনের দিন, আবার একই সঙ্গে গভীর শোক ও আত্মত্যাগেরও স্মরণ। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ সংগ্রাম, নির্যাতন ও রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শুরু হয়েছিল আমাদের মুক্তির লড়াই, যা পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে সংগ্রামের সূচনা, তা নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বিজয়ে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু এই স্বাধীনতার পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ, রক্তস্নাত এবং বেদনাময়।
স্বাধীনতার সূচনালগ্নে যে ভয়াবহতার মুখোমুখি হয়েছিল বাঙালি জাতি, তার নির্মমতম অধ্যায় ২৫ মার্চের কালরাত্রি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট–এর মাধ্যমে নিরস্ত্র মানুষের ওপর চালায় ইতিহাসের এক বর্বরতম গণহত্যা। ঢাকার রাস্তায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে, গ্রাম-গঞ্জে—সবখানেই চলেছে নির্বিচার হত্যা। শিশু, নারী, বৃদ্ধ—কেউই রক্ষা পায়নি। সেই রাত ছিল বাঙালির অস্তিত্ব মুছে ফেলার এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।
কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এই নৃশংসতা বাঙালিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং সেই রাতই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা হয়ে উঠেছিল আরও দৃঢ়, আরও অদম্য। দেশের সর্বস্তরের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তির সংগ্রামে। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক—সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে রুখে দাঁড়ায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এই সম্মিলিত প্রতিরোধই পরিণত হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে।
এই যুদ্ধে শুধু বাহ্যিক শত্রুই ছিল না, ছিল এদেশীয় দোসররাও। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হয়ে নিজেদের মানুষদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে তারা হয়ে উঠেছিল এক কালো অধ্যায়ের অংশ। তাদের ভূমিকা আমাদের ইতিহাসে চিরকাল ঘৃণিত হয়ে থাকবে। স্বাধীনতার এই ইতিহাস তাই শুধু বীরত্বের নয়, এটি বিশ্বাসঘাতকতার কথাও বলে—যা আমাদের সতর্ক করে দেয়, জাতির শত্রু কখনো কখনো নিজের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।
স্বাধীনতা অর্জনের এই সংগ্রাম আমাদের শুধু একটি ভূখণ্ড দেয়নি; দিয়েছে একটি চেতনা, একটি মূল্যবোধ। সেই চেতনার মূল কথা—ন্যায়বিচার, মানবিকতা, সমতা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই চেতনাকে ধারণ করতে পেরেছি?
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়েও পার করেও আমরা এখনও যেন পরাধীন। রাজনৈতিক বিভাজন, সহিংসতা, দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য—এসব আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক সময় আমরা নিজেদের মধ্যেই বিভক্ত হয়ে পড়ি, ভুলে যাই যে স্বাধীনতার মূল শক্তি ছিল ঐক্য। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ইতিহাস বিকৃতির প্রবণতা। একটি জাতির জন্য তার ইতিহাসই তার শক্তি, তার পরিচয়। যদি সেই ইতিহাস স্বাধীনতার পরাজিতদের কবলে পরে বিকৃত হয়, তবে জাতির ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। যেই চেষ্টা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ২১ বছর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আবারও সেই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানো অত্যন্ত জরুরি। তাদের জানতে হবে, কী ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীনতা, কেন ২৬ মার্চ শুধু একটি দিবস নয়—এটি একটি আত্মত্যাগের প্রতীক।
আজকের বিশ্বেও আমরা দেখি যুদ্ধ, দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু একটি জাতীয় ইতিহাস নয়; এটি বিশ্বমানবতার জন্যও একটি অনুপ্রেরণা। এটি শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসই একটি জাতিকে মুক্তি দিতে পারে।
মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের শুধু অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না; এটি আমাদের সামনে একটি দায়িত্বও তুলে ধরে। সেই দায়িত্ব হলো—স্বাধীনতার চেতনাকে বাস্তবায়ন করা। একটি ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তোলা। যেখানে প্রতিটি মানুষ তার অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারে, যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত।
আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক— আমরা স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করব। আমরা বিভাজন নয়, ঐক্যের পথে হাঁটব। আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হব, সত্যের পক্ষে দাঁড়াব। আমরা ইতিহাসকে সম্মান করব, শহীদদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করব।
মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা কোনো একদিনের অর্জন নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিদিন আমাদের তা রক্ষা করতে হয়, লালন করতে হয়। আজকের এই মহান দিনে আমরা যেন সেই দায়িত্ব নতুন করে অনুভব করি।
৩০ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত এই লাল-সবুজ পতাকার মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। তবেই স্বাধীনতা দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি হবে, তবেই আমাদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে, তবেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে একটি উজ্জ্বল, মানবিক ও গৌরবময় ভবিষ্যত। তাই আজকের অঙ্গীকার হোক—আমরা স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধ ধারণ করব, ইতিহাসকে বিকৃত হতে দেব না, এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলব। তবেই মহান স্বাধীনতা দিবসের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা পাবে এবং শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।
লেখক বাংলাদেশের সমাজসেবী এবং মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক