নয়ন বিশ্বাস রকি
প্রথমে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দিয়ে লাগাতার দুই মাস ধরে একটানা মিথ্যা বলানো হল—বিগত শেখ হাসিনা সরকার নাকি কোনো ধরনের টিকা দেয়নি, তাই এখন শিশু মারা যাচ্ছে। কিন্তু জনগণ যখন স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দুষতে শুরু করল তখন সে সুদখোর ইউনুসের নাম নেওয়া শুরু করে। যখন দেখা গেল স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে নিয়ে কাজ হচ্ছে না তখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই চলে এলেন মিথ্যা রোগের ঝুড়ি নিয়ে সুদখোর ইউনূসকে বাঁচাতে। আশ্চর্যের বিষয়, ভুলেও তাঁরা মাঝখানের দুই বছরের শাসক ইউনূসের নাম নিলেন না। যেন তিনি চাঁদ থেকে নেমে এসেছিলেন, আর তার সময়ের কোনো দায়-দায়িত্বই ছিল না !
এদের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, হাসিনা সরকার সব কিনে রেখে যায়নি কেন, অথচ দুই বছর আগে হাসিনার পতন হলেও তাঁর মজুদ দিয়েই দেশ চলছে—যেমন চাল ডাল ওষুধ সেলাইন কীটনাশক সবকিছু হাসিনারই মজুদ করা। কিন্তু এঁরা এতটাই নির্লজ্জ যে হাসিনার নাম ওখানে কালি দিয়ে মুছে তাঁরা নিজেদের নামে প্রচার করছেন। অথচ এই দুই বছরে নতুন কিছু উৎপদনই করতে পারেননি।
এখন তাঁরা বলছেন, টিকা কেন মজুদ করেনি দুই বছর আগে। কিন্তু মাঝখানে দুই বছর তথাকথিত সরকার কি করলো ? এদিকে নজর দেওয়া কি তাঁদের দায়িত্বে ছিল না ? অথচ এক্ষেত্রে তাঁরা ইউনূসের নাম নিচ্ছেন না। কারণ খুবই সহজ—ইউনূসের ক্ষমতার অন্যতম স্টেকহোল্ডার বিএনপি নিজেও। ইউনূসের ব্যর্থতা স্বীকার করলে নিজেদের ব্যর্থতাও প্রকাশ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ জানে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে টিকার অভাব ছিল না। নিয়মিত ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি দেশের আনাচে-কানাচে টিকার সহজলভ্যতা ছিল। হাম-পোলিওর মতো বহু রোগ নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। বাংলাদেশের Expanded Programme on Immunization (EPI) বিশ্বে সফল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। এই সাফল্যের জন্য আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসা ও সম্মাননা এসেছে।
অথচ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে একটি টিকাও আমদানি করা হয়নি—এমন অভিযোগ এখন মানুষের মুখে মুখে। প্রশ্ন উঠেছে, কোনো মহামারি ছড়িয়ে পড়লে বিদেশি এনজিওর মাধ্যমে টিকা কর্মসূচি চালিয়ে অর্থায়নের ভাগ-বাটোয়ারার হিসাব ছিল কি না ! আজ শত শত শিশুর মৃত্যুর পেছনে সেই গাফিলতির দায় কে নেবে? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইউনূস ও তার উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিচারের মুখোমুখি না করে এখন উল্টো দায় চাপানোর চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগের ওপর। কারণ আছে।
ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র টিকা সহায়তার কথা বলেছে। কিন্তু শর্ত—এনজিওর মাধ্যমে বিতরণ, কারণ স্বাস্থ্য বিভাগে জনবল সংকট, মাঠকর্মীর অভাব। এখন প্রশ্ন হল, এই বিদেশি অর্থায়নের টাকা কারা খাবে ? ইউনূসের এনজিও, তার উপদেষ্টা গোষ্ঠী, আর তারেক রহমানের সরকার—এই সমীকরণ কি মানুষ বুঝে না ?
এখন আসি বাস্তবতায়—
বাস্তবতা ১:
বাংলাদেশের সবচেয়ে গর্বের জায়গাগুলোর একটি ছিল টিকাদান কর্মসূচি। সেটিকে ধ্বংস করেছেন ইউনূস। শত শত শিশু মারা যাচ্ছে, অথচ তারেক জিয়া তাকে এককভাবে দোষারোপ করতে ভয় পাচ্ছে। নাকি লন্ডনের কোনো চুক্তি অনুযায়ী সমালোচনা থেকে বিরত আছেন ?
বাস্তবতা ২:
২০২৪-২৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বিদায় নেওয়ার পর প্রশাসনিক অস্থিরতা, সীমাহীন লুটপাট, দুর্নীতি, অদক্ষতা ও স্বাস্থ্যখাতে সমন্বয়হীনতার কারণে টিকাদান কাভারেজ ভয়াবহভাবে কমে যায়। এই দায় এড়িয়ে আগের সরকারকে দোষারোপ করা রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কৌশল ছাড়া কিছু না।
বাস্তবতা ৩:
আজ তারেক রহমান NHS মডেল, ৫% জিডিপি বরাদ্দ, স্বাস্থ্য সংস্কারের কথা বলছে। এগুলো নতুন কোনো ধারণা নয়। বহু বছর ধরেই বিশেষজ্ঞরা এসব সুপারিশ দিয়ে আসছেন। আওয়ামী লীগ সরকার স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ করেছে। আর বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে স্বাস্থ্যখাত ছিল লুটপাটের কেন্দ্র।
বাস্তবতা ৪:
১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, ই-হেলথ কার্ড, উপজেলা আধুনিকীকরণ—শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু অর্থ কোথায় ? জ্বালানি ভর্তুকিতে দুই মাসেই বিপুল টাকা গেছে। তিন মাসে ব্যাংক ঋণ ৭৮ হাজার কোটি টাকা, নয় মাসে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। জিডিপি নেমে সাড়ে তিন শতাংশে। সামনে মূল্য সমন্বয় হলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। সেই ধাক্কা বিএনপির মতো অনভিজ্ঞ সরকার সামলাতে পারবে কি না, বিশেষজ্ঞদেরই সন্দেহ।
যে আওয়ামী লীগ সরকার টিকাদান কাঠামো দাঁড় করিয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করেছে, মাতৃমৃত্যু কমিয়েছে—তাদের পুরোপুরি ব্যর্থ দেখানোর চেষ্টা ইতিহাস বিকৃতি ছাড়া আর কিছু নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট (HA) রেজিস্টারগুলো চেক করে দেখেন ভাইয়্যা। অবশ্য আপনি তো এসব বুঝবেন না। মাঠপর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রম কিভাবে চলতো, কোন এলাকায় কত শিশু টিকা পেয়েছে, সবকিছুর রেকর্ড এখনো আছে।
শেখ হাসিনাকে জাতিসংঘ ৯৮% টিকা কাভারেজ অর্জনের জন্য পুরস্কৃত করেছিল। এটা কোনো গোপন তথ্য না, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত বিষয়। একটু পড়াশোনা করলে জানতেন। মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষ আপনাকে নিয়ে হাসাহাসি করে কারণ আপনি কথা বলেন বেশি, তথ্য জানেন কম।
এ কথা ভুললে চলবে না—যেসব শিশু এখন মারা যাচ্ছে, তাদের বয়স ৬ মাস, ৯ মাস, সর্বোচ্চ ১১ মাস। অর্থাৎ শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার সময় তারা জন্মই নেয়নি। তাহলে হাসিনা গিয়ে তাদের টিকা দেবে কীভাবে ? বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জনগণই বিবেচনা করবে আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশ কেমন পরিচালনা হয়েছে আর বিগত ইউনুসের শাসন আর বর্তমানে বিএনপির শাসন কেমন হচ্ছে জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস তাই জনগণের উপর ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এবং সামনের দিনে কি করণীয় জনগণই ব্যবস্থা নেবে।