ধর্মকীর্তির বুদ্ধমূর্তি
অসীম সেন
পর্ব-৫
সকালে ত্রিপাঠীদের বাড়ি। উপস্থিত অসীম, নীরজ, প্রফেসর বাগচি, সমিতা বাগচি, শহরের পুলিশ সুপার এবং এস ত্রিপাঠী। ত্রিপাঠীর মুখটা ঝুলে আছে।
অসীমঃ ব্যাপারটা কিন্তু এখনও বোধগম্য হচ্ছে না জামাইবাবু। একটু আলো ফেলুন।
প্রফেসর বাগচিঃ বুদ্ধমূর্তিটার আর্কিওলজিক্যাল ভ্যালু কত বলে তোমার মনে হয় অসীম
অসীমঃ ওই যে বললেন ২০ কোটি টাকা।
প্রফেসর বাগচিঃ ঠিকঠাক গ্রাহক এর জন্য ২০ কোটির কয়েক গুণ টাকা দিতে পারে। এমন একটা জিনিশ হাতছাড়া হয়ে যাবে তা ঠিক মেনে নিতে পারছিলেন না ত্রিপাঠজী। অথচ দেশের সম্পদ এভাবে নিজের কাছেও রাখতে পারছিলেন না। জিনিসটা যে ওনাদের পারিবারিক সম্পত্তি, তারও বোধহয় পাকাপোক্ত প্রমাণ নেই। হ্যাঁ, এটা ঠিক আপাতত ওটা ওদের জিম্মাতেই ছিল। এত দামি জিনিশ ইনস্যুরেন্স থাকবে এটা স্বাভাবিক। প্ল্যান করলেন ত্রিপাঠী। যদি এটাকে চুরি দেখানো যায় তাহলে ইনস্যুরেন্স থেকে মোটা টাকা তো পাবেনই, পরে সুযোগ বুঝে সরকারের চোখ এড়িয়ে বিদেশে পাচারও করে দেওয়া যাবে। তার জন্য বোধহয় ব্যবস্থাও করে ফেলেছিলেন। কী বলেন মিষ্টার ত্রিপাঠী ? কিন্তু শনিবার তড়িঘড়ি চুরিটা করতে গেলেন কেন ? একটু বলবেন কি ?
ত্রিপাঠীঃ ঘরে বিভীষণ এসেছিল। কয়েকদিন ধরেই দেখছিলাম আমি বাইরে বেরোলেই কেউ আমাকে ফলো করছে। বুঝলাম মূর্তি নিয়ে বাইরে বেরোনো নিরাপদ নয়। তারওপর শনিবার সকালে দেখলাম আমার দেরাজের চাবিটার গায়ে সাবান লেগে আছে। বুঝলাম চাবির নকল হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। বুঝলাম আর দেরি করা যাবে না।
অসীমঃ কিন্তু যে সে তো আর মূর্তিটা কিনবেন না, তবে কি নীরজের বন্ধু!
প্রফেসর বাগচিঃ ওটাতো চুনোপুটি। ২০ কোটি খুচরো টাকার জন্য এত বড় রিস্ক নিতেন না ত্রিপাঠী। সেটুকু টাকা ওনার নিজেরই আছে। কিছুদিন আগে আমেরিকার ধনকুবের উইলিয়াম থিওডার ভারতে এসেছিলেন। পড়েছ খবরটা ?
অসীমঃ উইলিয়াম থিওডার! প্রাচীন বস্তু সংগ্রহে রাখা যার হবি ?
প্রফেসর বাগচিঃ আরে বাবা হ্যাঁ। আর কতজন থিওডারকে তুমি চেনো শুনি ? উনি সাংবাদিকদের সামনে কৌতুহল বশত এই মূর্তিটার কথা একবার উল্লেখ করেছিলেন। খুব ছোট বিষয়, চোখ এড়িয়ে যাবার কথা। কিন্তু চোখ এড়ায়নি ত্রিপাঠীজীর। প্ল্যান করে ফেললেন। নিজের ঘর, নিজের দেরাজ। মূর্তিটা সরিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ। কিন্তু চুরি দেখাতে না পারলে সন্দেহ গিয়ে পড়বে ওনার ওপর। ওনার দোতলার ঘরের জানলাটার লোহার রডগুলি যে আলগা তা আমি আগেই বুঝেছিলাম। সেই পথেই রাতের অন্ধকারে মূর্তি নিয়ে বাইরে বেরিয়েছিলেন উনি। নামতে গিয়ে পা পিছলে চোট। কী ঠিক বললাম তো ?
চুপ করে বসে রইলেন ত্রিপাঠী
প্রফেসর বাগচিঃ ওদিকে বাপ বেটায় ঝগড়া। রাতের বেলায় জেগেই ছিলেন সুদর্শন বাবু। ধপ করে একটা আওয়াজ পেয়ে জানলা দিয়ে দেখলেন ত্রিপাঠীজী বাগানের দিকে যাচ্ছেন। পিছু নিয়ে বুঝলেন নিজের ঘরেই সিঁদ কেটেছেন তিনি। সুদর্শন বাবুকে দেখে চমকে উঠলেন ত্রিপাঠী। অগত্যা টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করেছিলেন তিনি।
সমিতাঃ কিন্তু মূর্তিটা কোথায় ?
প্রফেসর বাগচিঃ ধৈর্য ধরুন ম্যাডাম, ধৈর্য ধরুন। পুরকাইতবাবু জিনিসটা নিয়ে আসুনতো
একজন হাবিলদার কাঁধে করে একটা গাছের টব নিয়ে এলেন।
সমিতাঃ একি গাছের টব নিয়ে এলে যে !
গাছের মাটি খুঁড়তেই দেখা গেল প্লাস্টিকে মোড়া বুদ্ধের মূর্তিটি।
অসীমঃ (হাতে নিয়ে ) অপূর্ব সুন্দর! কিন্তু জামাইবাবু আপনি জানলেন কী করে যে বাগানে টবের মধ্যে লোকানো আছে এই সাত রাজার ধন।
প্রফেসর বাগচিঃ ওই যে পিঁপড়ে। পিঁপড়েই ধরিয়ে দিল ত্রিপাঠীকে।
সমিতাঃ আবার পিঁপড়ে।
প্রফেসর বাগচিঃ প্রথম যেদিন ত্রিপাঠীর বাড়ি এসেছিলাম। জানলায় দেখি পিঁপড়ের বাসা। এত টিপটপ বাড়ি সেখানে কিনা পিঁপড়ে! ভালো করে দেখি বেশ কয়েকটা চিনির দানা পড়ে আছে। তলায় গিয়ে দেখলাম সেখানেও বেশ খানিকটা চিনি পড়ে আছে। ভিজে মাটিতে গলেনি, পুরোটা পিঁপড়ে খায়নি। তার মানে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চিনিগুলি সেখানে ছিল না। খটকাটা তখনই লেগেছিল।
সমিতাঃ চিনির সঙ্গে মূর্তির কী সম্পর্ক?
প্রফেসর বাগচিঃ সেটাতো আমারও মাথায় ঢুকছিল না। সুদর্শনবাবু যেদিন খুন হলেন, ত্রিপাঠীর বাড়ি থেকে ফিরে লেকের ধারে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারতে গিয়েছিলাম। মাথাটা একটু ছাড়াবার জন্য। রামশরণের চায়ের দোকানে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ ঝিরঝিরে বৃষ্টি। মানিব্যাগটা বাঁচাতে রামশরণের কাছ থেকে একটা প্লাস্টিক চাইলাম। সে দিল। এবং আমার জ্ঞান চক্ষু খুলে দিল। প্লাস্টিক ঝাড়তে ঝাড়তে বলল এর মধ্যে চিনি ছিল। ভালো করে না ঝেড়ে দিলে পিঁপড়ে ধরে যাবে।
প্রফেসর বাগচিঃ আরে বুঝলে না ? ওনার দেরাজের ওপরেই চিনির বয়াম রাখা থাকত। বোধহয় ঠাকুরকে দিতেন। ঠাকুরের ব্যাপার, চাকরের অধিকার ছিল না বয়ামটা ছোঁয়ার। চিনি তাই প্যাকেট বন্দীই ছিল। আর ত্রিপাঠীও সময় পাননি বয়ামে ভরার। এদিকে মূর্তিটা কাদা মাটিতে পুতে রাখলে যদি ক্ষতি হয়। রিস্ক নিলেন না ত্রিপাঠী। চিনি ফেলে প্লাস্টিকে ভরে নিলেন মূর্তিটি।
অসীমঃ কিন্তু উনি চিনিগুলি না ফেলে বয়ামেই তো রাখতে পারতেন?
প্রফেসর বাগচি মুখ খিচিয়ে উঠলেন
প্রফেসর বাগচিঃ কেন রাখেননি তা ওনাকেই জিজ্ঞাসা কর না। হতে পারে সে সময় বয়ামের বিষয়টা মাথায় আসেনি। নয়তো হতে পারে স্নান না করে ওই ঠাকুরের প্রসাদের বয়াম ছোঁবেন না।
সমিতাঃ তা কী করে বুঝলে যে ওই টবটাতেই মূর্তিটা লোকানো আছে?
প্রফেসর বাগচিঃ সেই পিঁপড়ে। সুদর্শন বাবু যেদিন খুন হলেন, সেদিন একটা বিষয় আমাকে স্ট্রাইক করল। মূর্তিটা নিশ্চই বাড়ির বাইরে বেরোয়নি। তাহলে খুন হতে হত না সুদর্শন বাবুকে। অসীমরা যখন সুদর্শন বাবুর লাস নিয়ে ব্যস্ত, আমি গেলাম বাগানের পিছনের দিকে।
অসীমঃ হ্যাঁ হ্যাঁ…জামাইবাবু তখন আমাদের সঙ্গে ছিলেন না বটে।
প্রফেসর বাগচিঃ বাগানটা ভালোই সাজিয়েছিলেন ত্রিপাঠীজী। হাজার হাজার মরসুমি ফুলের টব। তারমধ্যে নজর গেল একটি ডালিয়া গাছের দিকে। ডালিয়া ফুটে আছে। কিন্তু পাতা গুলি নেতানো। এত যত্নে থাকে গাছগুলি। এ গাছটার অবস্থা এমন কেন ? গাছটার কাছে গিয়ে দেখালম মাটিতে ভর্তি পিঁপড়ে।
অসীমঃ আবার পিঁপড়ে!
প্রফেসর বাগচিঃ বুঝলে না চিনির প্লাস্টিকে চিনি থেকে গিয়েছিল খানিকটা। তারই খোঁজে পিঁপড়ের দল হানা দিয়েছিল। এরপর যতদিন এসেছি দেখেছি গাছটা ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে। বুঝলাম মূর্তিটা লোকানোর তালে তাড়াহুড়োর মাথায় মাটি খুঁড়তে গিয়ে মূল শিকড়টাই কেটে গেছে ।
অসীমঃ আপনি রাজ্যের সম্মান বাঁচালেন।
মূর্তিটি সযত্নে তুলে দিলেন পুলিশ সুপারের হাতে।
অসীমঃ জামাইবাবু জুগ জুগ জিও
প্রফেসর বাগচিঃ তাহলে যাবার সময় রাজভোগ খাইয়ে দিও।
শেষ