চোর
অসীম সেন
পর্ব-২
এরপর কেটে গেল বেশ কয়েক দিন। গোটা দিন গ্রামের এপাশে ওপাশে ঘুরে বেড়ায় অচিন্ত্য। হাতে নোটপ্যাড। একদিন গ্রামের প্রান্তে পদ্মদিঘীর পাড়ে সাইকেল নিয়ে যাচ্ছিল অচিন্ত। হঠাৎ করে মুখোমুখি ধাক্কা পিয়ালীর সঙ্গে। সেও সাইকেল নিয়ে আসছিল। পিয়ালী মাটিতে বসেই পায়ের গোড়ালিতে হাত বোলাতে বোলাতে বলে, আচ্ছা বেআক্কেলে লোক তো আপনি। কে দিয়েছে আপনার হাতে সাইকেল? চোখ কী আকাশে তুলে সাইকেল চালান ? অচিন্ত্যও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। তবু কিছুটা সামলে বললো, বেআক্কেলে আমি ? এটুকু সরু রাস্তায় এত জোরে কেউ সাইকেল চালায়?
– আপনার মত টুকটুক করে সাইকেল চালালে আমি ট্রেন ধরতে পারব ? এগারটা পঁয়তাল্লিশে ফিলোজফির ক্লাশ। আপনার জন্য মিস করলাম।
– আপনি আবার লেখাপড়াও করেন ? দেখে তো মনে হয় না।
– দেখুন মুখ সামলে কথা বলুন। এত বড় ধাড়ি ছেলে ঝাল খেতে পারে না, আবার বড় বড় কথা।
– ঝাল খাওয়ার সঙ্গে লেখাপড়ার কী সম্পর্ক তা তো বোঝা গেল না।
– আপনাকে বুঝতে কে মাথার দিব্যি দিয়েছে ? ভদ্র মহিলার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় তা তো জানেন না।
– ভদ্র মহিলা না ধানি লঙ্কা। যার ঘাড়ে ঝুলবেন তার কপালে দুঃখ আছে।
– আছে তো আছে। আপনি তো ঘাড়ে নিচ্ছেন না ?
হঠাৎ করে নিজের কথার মানে বুঝতে পেরে লজ্জা পেয়ে চলে যায় পিয়ালী।
এরপর কেটে যায় বেশ কয়েক দিন। অচিন্ত এখন এলাকার সকলের নয়নের মণি। শহরে গিয়ে নিজের পরিচিতি কাজে লাগিয়ে গ্রামের লাইব্রেরির জন্য নতুন বই কিনে এনেছে। চারটে বল আর এক সেট নতুন জার্সি কিনে দিয়েছে সর্বমঙ্গলা স্পোর্টিং ক্লাবকে। একদিন সন্ধ্যায় বুড়ো শিবতলার আড্ডার ঠেকে বসে আছে অচিন্ত। আসরে এলেন তালুকদার খুঁড়ো। নিজে থেকেই কথা পাড়লেন, পরানের পোয়াতি বউটাকে বাঁচানো গেল না।
তালুকদারের কথা শুনে অচিন্ত্য জিজ্ঞাসা করলো, কেন ?
– এখান থেকে সদরের হাসপাতাল ১০ কিলোমিটার দূরে। ভাঙা রাস্তা। নিয়ে যেতে যেতে প্রসব যন্ত্রণা ওঠে। হাসপাতালে পৌঁছতে হয়নি।
– গ্রামের হাসপাতালটায় ডেলিভারি করানো যায় না ?
– ওটা নামেই হাসপাতাল। ডাক্তার একজন আছে বটে। সে আসে নিজের মর্জি মতো। ওষুধ নেই, বেড ভাঙা, অপারেশন থিয়েটারের তো বালাই নেই। আজ যদি গ্রামে একটা হাসপাতাল থাকত তাহলে এভাবে একের পর এক পোয়াতি বউ গুলিকে মরতে হত না।
তালুকদারের কথা শুনে অবাক হল অচিন্ত্য। জিজ্ঞাসা করল, আপনারা সরকারের কাছে আবেদন করেননি ?
– আমরা গ্রামের মানুষ। আমাদের দ্বারা কি ওসব হয় ?
অচিন্ত্য বিধান ডাক্তারকে বলে, কাকা… তাবলে বিনা চিকিৎসায় এভাবে মানুষ মারা যাবে ?
বিধান বলল, এটাই তো এদের ভবিতব্য। বিধান ডাক্তারের কথা শুনে অচিন্ত্য বলল, আমি কালই শহরে যাব। এ গ্রামে হাসপাতাল হবেই। অচিন্ত্যের কথা শুনে তারিণী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ওই হাসপাতাল বাড়ির পাশেই আমার বিঘে খানেক জমি আছে। আমার তো তিন কুলে কেউ নেই। বাবা তুমি যদি এ গাঁয়ে একটা হাসপাতাল করতে পার, তাহলে জমি আমি দেব।
এরপরে গ্রামে নতুন কর্মযজ্ঞ শুরু হল। শহর থেকে ইঞ্জিনিয়ার এসে জমি মেপে গেলেন। তারিনী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমিতে ইট, বালি পড়তে লাগল। অচিন্ত্য যেন নাওয়া খাওয়া ভুলেছে। কখনও ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলছে, কখনও বা মিস্ত্রীদের সঙ্গে হাতে হাত লাগাচ্ছে। দুপুরে হাসপাতালের মাঠেই খাবার নিয়ে আসে পিয়ালী। এসেই স্বভাবসিদ্ধ গলায় বলে, এই বেলা পর্যন্ত আমি রোজ রোজ না খেয়ে বসে থাকতে পারব না বলে দিলাম। পিয়ালীর কথা যেন অচিন্ত্যের কানে গেল না। কিছু বলছে না দেখে পিয়ালী জোর গলায় বলল, এই যে আপনাকে বলছি। সূর্য তো পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। এরপরে খেলে তো পিত্তি পড়বে। এবার উত্তর দিল অচিন্ত্য, আপনি তো দেখছি ভীষণ জ্বালান। আপনি খেয়ে নিন না। কে বারণ করেছে। অচিন্ত্যের কথা শুনে প্রায় মুখ ঝামটে বলল, তারপর গ্রামের লোকে আমার বাবাকে ছি ছি করুক। দায়িত্ব নিয়েছে অথচ পালন করেনি। অচিন্ত্য নির্বিকার ভাবে উত্তর৪ দিল, সেটা আমি আর কাকা বুঝে নেব। আপনাকে বুঝতে হবে না।
– তা তো বটেই। আপনি আর আপনার কাকাই তো বুঝবেন। বেশি কথা না বাড়িয়ে চট করে খেতে আসুন। দু’ মিনিট খেয়ে নিলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।
অচিন্ত্য হাত ধুয়ে আসতে আসতে বলে, এই যে সময় মতো ভালো ভালো খাবার দিয়ে স্বভাব নষ্ট করছেন। এরপর আপনি না থাকলে আমার কী হবে শুনি ? দিব্যি ছিলাম ভবঘুরে মানুষ। দিলেন তো সব অভ্যাস নষ্ট করে। এবার কিন্তু শহরে যাবার সময় আপনাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাব। অচিন্ত্যর কথা শুনে পিয়ালী লজ্জ্বায় মাথা নিচু করে। বলে, কথার ছিরি দেখো। মুখে কিছু আটকায় না।
– আমার হাতে কিডন্যাপ হতে আপত্তি আছে ?
পিয়ালী বলে, জানি না যাও….
(চলবে)