কস্তুরী সেনগুপ্ত
প্রায় ৪০০ খ্রীস্টপূর্ব থেকে ১২০০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের বিশাল ভূখণ্ডকে কিছু নারীরা শাসন করেছেন। নারী “প্রশাসক” হিসেবে তাঁরা কেমন ছিলেন, এটাই আজ প্রতিপাদ্য বিষয়।
স্ত্রী- রাজ্য
ভারতীয় সাহিত্যের অনেক জায়গায় স্ত্রী -রাজ্যের উল্লেখ আছে। যেমন “জৈমিনি ভারত ” গ্রন্থের ২২ তম অধ্যায়ে আমাজন দেশের প্রমীলা নামে এক নারীর উল্লেখ আছে । তিনি পান্ডব বংশীয় বীর অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। যদিও প্রমীলা চরিত্রটি একটি কল্পনা মাত্র, তথাপি প্রাচীন ভারতে স্ত্রী-রাজ্যের অস্তিত্ব একেবারে অলীক কল্পনা মাত্র নয়। কারণ, এর উল্লেখ অনেক প্রাচীন গ্রন্থে আছে। সপ্তম শতাব্দীর চিনা পরিব্রাজক হিউ- এন- সাং এর” সি -য়ু- কি ” গ্রন্থেও এর উল্লেখ আছে। এতে লেখা রয়েছে, ব্রহ্মপুত্র দেশের উত্তর দিকে, বর্তমান কুমায়ুন- গাড়োয়াল সন্নিহিত হিমালয় প্রদেশে “সুবর্ণগোত্র নামে একটি দেশ( রাজ্য) আছে।… এটাই হলো ‘পূর্ব নারী রাজ্য’। একে নারীরাজ্য নামে অভিহিত করার কারণ হল, রাজ্যটি বংশপরম্পরাক্রমে নারীগণ দ্বারাই শাসিত হয়ে আসছে। নারীর স্বামীরাই হতেন রাজা। কিন্তু, তিনি রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালনা করতেন না। কোন বিদ্রোহ দেখা দিলে রাজা তার দমন করতেন এবং তিনি জমি জমার চাষবাসের দেখাশোনা ও ব্যবস্থাদি করতেন।”
আটকিনসন(Atkinson ) রচিত ‘হিমালয় জেলা’ নামক গ্রন্থে এই উক্তির সমর্থন পাওয়া যায়। এই গ্রন্থের মতে তিব্বতের নু- ওয়াং উপজাতি একজন নারী কর্তৃক শাসিত হতো। তাঁর নাম ছিল ‘পিনচিন’। হিউ এন- সাং আরেকটি স্ত্রী- রাজ্যের উল্লেখ করেছেন। এই স্ত্রী -রাজ্যের নামকরণ তিনি করেছেন ‘পশ্চিম স্ত্রীরাজ্য ‘। এই রাজ্যটি হল বর্তমান বালুচিস্থান প্রদেশের অন্তর্গত লাংকারার নিকটবর্তী স্থানে।
বাকাটক – রানী প্রভাবতী গুপ্তা
প্রভাবতী গুপ্তা ছিলেন উত্তর ভারতের গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের (৩৭৬-৪১৪ খ্রীঃ) কন্যা। এবং বিশাল দাক্ষিণাত্য প্রদেশের বাকাটক বংশীয় শাসক রাজা দ্বিতীয় রুদ্রসেনের প্রধান রাজমহিষী। খ্রীষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দী পূর্ণ হবার পূর্বেই রাজা দ্বিতীয় রুদ্রসেনের মৃত্যু হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। দ্বিতীয় রুদ্রসেনের মৃত্যুর সময় তাঁর পুত্ররা নাবালক ছিলেন এবং মহারানী প্রভাবতী গুপ্তা অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র দিবাকরের প্রতিনিধি হিসেবেই রাজ্য শাসন করেন। এই কাহিনীটি সত্য হতেও পারে, আবার না -ও হতে পারে।
উড়িষ্যার ভৌমকর বংশীয় বিভিন্ন সম্রাজ্ঞী শাসিকা
প্রাচীন ভারতে পত্নী অথবা কন্যারা কোন রাজার মৃত্যুর পর সাধারণত তাঁর সিংহাসনের উত্তরাধিকারিণী হতে পারতেন না। এই বংশে বিভিন্ন সময়ে ৬ জন সম্রাজ্ঞী রাজসিংহাসনে বসেন। নবম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে ভৌমকরবংশীয়গণ নিম্ন উড়িষ্যা অঞ্চলে শাসন করেছিলেন।
- রাজ্ঞী প্রথম ত্রিভুবন – মহাদেবী : প্রথম ত্রিভুবন – মহাদেবী ছিলেন রাজা ললিতহারের পত্নী এবং দক্ষিণ নাগবংশীয় সামন্ত রাজমল্লের কন্যা। একটি প্রত্নলিপি – অনুসারে রাজা তৃতীয় শুভাকরের মৃত্যুর পর, তাঁর মাতা ত্রিভুবন – মহাদেবী তাঁর পৌত্রের নাবালক অবস্থায় কয়েক বছর রাজ্য শাসন করেছিলেন।
- সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ত্রিভূবন – মহাদেবী : তিনি ছিলেন রাজা চতুর্থ শুভাকরের পত্নী। শুভাকর ছিলেন তৃতীয় শিবকর রাজার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। তৃতীয় শিবকরের মৃত্যুর পর ত্রিভুবন – মহাদেবী সিংহাসনে বসেন।
- রানী গৌরী – মহাদেবী এবং দন্ডি- মহাদেবী : রাজা পঞ্চম শুভাকরের মৃত্যুর পর, অন্ততপক্ষে চার জন সম্রাজ্ঞী পরপর এই রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। এই চার জন শাসিকা সম্রাজ্ঞীর মধ্যে সর্বপ্রথমা ছিলেন গৌরী- মহাদেবী। গৌরী -মহাদেবীর শাসনকালের কোন বিবরণী এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাঁর পর তাঁর কন্যা দন্ডি- মহাদেবী সিংহাসনে বসেন। তিনি কমপক্ষে আট বছর রাজ্য শাসন করেন।
- রানী বকুল -মহাদেবী এবং ধর্ম- মহাদেবী : দন্ডি- মহাদেবীর পর তার স্থলাধিকারিণী হন তাঁর বিমাতা, বকুল -মহাদেবী। তার শাসনকালের কোন বিবরণ ও সঠিক ভাবে জানা যায় না।এরপর তাঁর স্বামীর জ্যেষ্ঠভ্রাতা তৃতীয় শান্তিকরের পত্নী ধর্ম- মহাদেবী তাঁর স্থলবর্তিনী হন। তিনিই ভৌমকর বংশীয়দের সর্বশেষ শাসিকা হিসেবে জ্ঞাত।
৪. রানী দিদ্দা এবং কয়েকজন কাশ্মিরী বীরাঙ্গনা
রানী দিদ্দা : কাশ্মীরের ইতিহাস খ্রীস্টীয় ৯৫৮ থেকে১০০৩ বছর পর্যন্ত মহারানী দিদ্দার ব্যক্তিত্বে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তিনি ছিলেন লোহারার রাজা সিংহরাজের কন্যা। কাশ্মীর রাজ ক্ষেমগুপ্তের (৯৫০-৮খ্রীষ্টাব্দ) সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। খ্রীস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কবি কলহন রচিত কাশ্মীরের ইতিহাস “রাজতরঙ্গিনী ” গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, স্বামীর উপর দিদ্দার খুবই প্রভাব ছিল।
৯৫৮ খ্রীস্টাব্দে ক্ষেমগুপ্তের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র অভিমন্যু বিধবা রানী মাতার অভিভাবকত্বে সিংহাসনে বসেন। অভিমন্যুর শাসনকালে দিদ্দা ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন। ৯৭২ খ্রীস্টাব্দে তাঁর পুত্র রাজা অভিমুন্যর মৃত্যু হয়। পুত্রের মৃত্যু দিদ্দাকে শোকাহত করে। কিন্তু তাঁর ছিল দুর্দমনীয় ক্ষমতা লিপ্সা। অবশেষে তিনিই নিজেই ৯৮১ খ্রীস্টাব্দে কাশ্মীরের সিংহাসনে বসেন। ১০০৩ খ্রীস্টাব্দে দিদ্দার মৃত্যু হয়।
তিন শতাব্দী পর প্রায় ১৩৩৮ খ্রীস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে কোটাদেবী অল্প সময়ের জন্য কাশ্মীরের রাজসিংহাসনে বসেন।
সিল্লা নামে অপর একজন বীরাঙ্গনা নারীর কাহিনী রাজতরঙ্গিনী গ্রন্থে উল্লেখ আছে। তিনি ছিলেন কাশ্মীর রাজ সুস্পলের (১১১২–২৮খ্রী:) সেনাপতি বিজয়ের মাতা।
যে সমস্ত প্রশাসিকা সম্রাজ্ঞীদের কথা বলা হল, তাঁদের ছাড়াও আরো কয়েকজন বীর নারীর কথা ভারতীয় ইতিহাস ও পরম্পরায় লিপিবদ্ধ আছে।