দ্বিতীয় পুরুষ
শাম্মী তুলতুল
ফারহানা কখনো কখনো তার বই পত্রর থেকেও মদের গন্ধ পায়। সে বুঝতে পারে না কেন এমন হচ্ছে। সে এটা মাথা থেকে ভ্রম ভেবে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এটা সব জায়গায় ঘটে। সে দিনদিন ভয়ের ভেতর চলে যাচ্ছে। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। আজ তার কাছে এসব যন্ত্রণা লাগছে। ভালো লাগছে না। তার এই বৃষ্টির টুপ টুপ শব্দ ভালো লাগত। এক মগ চা নিয়ে বারান্দায় বসে চুমুকে চুমুকে বৃষ্টি অনুভব করত। কিন্তু আজ সেই বৃষ্টির রাতটা ভয়ংকর মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ তাকে তাড়া করছে। সত্যি কিছু একটা ঘটছে। ভয় ভয় মন নিয়ে সে রাত পার করল। সকাল সকাল মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙে তার।
মা খুব চেঁচায়,সারারাত ভূতের ছবি দেখিস আর ঘুমের ভেতর চিৎকার করিস। কি হয়েছে বলতো দিন দিন তোর ?
ফারহানা অবাক, মা এসব কি বলছে,ফারহানা চুপ করে থাকে। কি বলবে তাও বুঝতে পারছে না।
মা বলে, কিরে কিছু বলিস না কেন ?
ফারহানা বলে, আমি ফ্রেস হয়ে আসি মা। এই বলে, ফারহানা ওয়াশরুমে চলে গেল। আয়নায় মুখ ধুতে ধুতে নিজেকে দেখল। দেখে তার চোখের নিচে ভাঁজ, চোখ ফোলা ফোলা। নেশা নেশা ভাব। তার বডির শেপটাও কেন যেন ইদানীং মিলছে না। ব্রা টাইট হচ্ছে। কোনরকম জোরাজোরি করে পড়া। স্বাস্থ্য ত আগের মতই আছে। এমন হচ্ছে কেন।
তার এতো সুন্দর চেহেরা এতো সুন্দর শরীর, কলেজে তাকে সুন্দরী, কিউট,সেক্সি, ছাড়া কেউ কথায় বলেনা। এমন কেন দেখাচ্ছে সেই মায়াবী গড়নের শরীরটা। সে ভাবছে আর ভাবছে। ভেবেই সে ফ্রেস হয়ে রেডি হয়ে কলেজে যেতে রের হয়ে গেল। মা নাস্তা করতে ডাকবে সে সুযোগটাও দিল না। কলেজে এসে বান্ধবী মিতুর কাছে এল। মিতু বলে, কিরে কেমন আছিস ?
হুমম।
হুমম কি?
আদিল কই ? নাজিয়ার সাথে কথা বলছে।
ফারহানা অবাক হল, নাজিয়ার সাথে তার ভালো পরিচয় নেই। ক্যাম্পাসে আদিল কে পেছন থেকে ডাক দিল ফারহানা।
আদিল বলে,আসছি।
কিন্তু ফারহানার তর সয়না। সে আবার ডাক দেয়।
কিন্তু আদিল বিরক্ত হয়। নাজিয়াকে বিদায় দিয়ে কাছে এসে বলে, কি ব্যপার ? এতো তাড়া কিসের ?ফারহানা চুপ। একি আদিলের গায়ে থেকেও সেই একই গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ফারহানাকে চুপ থাকতে দেখে আদিল বলে, কি হল চুপ কেন ? ফারহানা ভাবনা থেকে সরে এসে বলে,তুমি আজ আমার কল ধরনি কেন ?
বিজি ছিলাম বইন।
বইন ?
হুমম,এসব ফান বোঝনা ? আচ্ছা চল ক্যান্টিনে যাই। ইচ্ছে নেই পরে যাব।
ফারহানার আদিলের এসব আচরণ ভালো লাগলো না। হঠাৎ পরিবর্তন, তাও এত জলদি। কয়েকদিন ধরেই সে এমন করছে। ফারহানা সারাদিন ক্লাস শেষে বাসায় একা আসতে দেখে মা বলে, আদিল এল না আজ ? ফারহানা একটু অবাক আদিল কেন আসবে মা ?রোজ তোর মাইগ্রেন সমস্যা হয়ে বেহুশ থাকিস, তোর বন্ধুই তোকে নিয়ে আসে। রুমে যত্ন নেয়। ফারহানার চোখ কপালে।
মাকে এবারেও সে কোন প্রশ্ন করল না। হাত নিশ পিশ করছে,আঙ্গুলগুলো মোচড়াচ্ছে। ফারহানা বুঝতে পারছে না তার সাথে কী ঘটছে। ফারহানার হঠাৎ পেট ব্যথা করছে। বাথরুমে বার বার যাচ্ছে আর আসছে কিন্তু ব্যথা কমেই না। মা তার চিৎকারে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে যে বিষয়টা জেনে তারা আকাশ থেকে পড়ল। ফারহানা প্রেগন্যান্ট।
মা শুধু মেয়ের দিকেই তাকিয়ে রইল। মা ধৈর্যের সাথে নিজের মাথা ঠান্ডা রাখে। কারণ আঠার বছর পর সন্তানের মুখ দেখেছিল। তাই মনটা নরম হয়ে গেল মেয়ের অন্যায়ের কাছে।
এতো বছর সন্তানের মুখ দেখা,তাই এসব অন্যায় পানসে মনে হল।
মাথায় হাত বুলিয়ে, মেয়েকে জিজ্ঞেস করে কে বল ? আমি কিছুই বলব না।
ফারহানা কি উত্তর দিবে বুঝল না। কে সে মানুষ, সেত নিজেও জানেনা। কিভাবে এটা হল,কবে হল। তবে তার জীবনে আদিল ছাড়া কোন পুরুষের অস্তিত্ব নেই এটা নিশ্চিত।
মা এই ব্যাপারে কাউকে কিছু বলল না। শুধু ফারহানা কে বলল, তাকে নিয়ে এসো। কথা বলব। ফারহানার রাত দিন এক হয়ে গেল। বান্ধবী মিতু তাকে কলে না পেয়ে বাসায় চলে এল।
মিতুকে সব খুলে বলে ফারহানা।
মিতু বলে, আদিল ত এখন নাজিয়াকে নিয়ে ব্যস্থ।
ওকে একবার আমার কাছে নিয়ে আসতে পারবি।
হুমম।
পরের দিন আদিলকে অনেক জোর করে মিতু নাজিয়ার ঘরে নিয়ে আসে। আদিল অনেক বিরক্ত।
বলে, ভাই তোমাদের কি হল আমাকে শান্তি দিবে না নাকি ? আদিল আমাদের এতো বছরের বন্ধুত্ব কি শেষ করে দিবে ?
তুমি হঠাৎ এমন আচরণ করছ কেন ? আমি একটা কথা বলব তুমি শুধু মন দিয়ে শোন।
কি বল তাড়াতারি বল।
ফারহ্যনা তার দু,হাতে মুঠ মেরে আদিলের চোখে চোখ রেখে বলে, আমি মা হতে যাচ্ছি।
কি কি কি ? আদিল তখন নিজেকে সামলিয়ে বলল, কে করল এই কাজ?
ফারহানা তাকে একটা চড় মেরে বলল, তুই করেছিস এই কাজ।
হোয়াট ? অপমান করতে ডেকেছ ? আর না। আমি গেলাম কার সাথে শু…এখন আমার কথা বলছ। ছি: ছি:। লজ্জা করেনা ?
আদিল আমার জীবনে আর কোন পুরুষ ছিলনা।
আরে শোন, সব মেয়েরা এটা বলে। শোয় একজনের সাথে বিয়ে আরেকজনকে করে। ফারহানা তার কথা শুনে টপ টপ চোখের পানি ফেলছে,আর অবাক হয়ে যাচ্ছে। এই সেই আদিল যে আমাকে পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে আমার পিছে ঘুরত। অথচ, আমি বলেছি আমরা বন্ধু থাকব। ফারহানার হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে কিন্তু গলা দিয়ে কান্না বের হচ্ছে না। আদিল ফারহানার হাত ছাড়িয়ে চলে গেল। ফারহানা চুপ হয়ে তার চলে যাওয়া দেখে রইল। আদিলকে ফেরানো যাবে না। এটা ফারহানা বুঝে গেল। ফারহানা দিনকে দিন তার রুমে দরজা বন্ধ করে রাত দিন এক করে সময় কাটাচ্ছিল। এদিকে মা ফারহানাকে অনেক বোঝাল যে অ্যাভারশন করে ফেলতে। ফারহানা কি করবে বুঝতে পারছেনা। সে ভাবছে এটা আদিলের বাচ্চা। সে কেন নষ্ট করবে। সে এই বাচ্চা জন্ম দিবে। ফারহানার এখন সামনে উঁচু পাহাড় সমান চিন্তা। কী হতে চেয়েছিল জীবনে কী হয়ে গেল তার সাথে। ফারহানা খুব মেধাবী একটা মেয়ে। ফিজিক্স এর ছাত্রী, সে মাস্টার্স করে শিক্ষকতা করবে এই ছিল তার লক্ষ্য। কিন্তু….।
এভাবে দিন অতিবাহিত হচ্ছিল। সব কিছু যখন স্বাভাবিক হতে লাগলো ফারহানার মায়ের রূপ দেখানো শুরু হল। কয়েকদিন যাবৎ রাতের বেলা মা দুধ নিয়ে আসে। ফারহানা খেতে না চাইলেও জোর করে খাওয়ায় বাচ্চার দোহায় দিয়ে।
এরপর আর কিছু সে টের পায়না। দরজা খুলে দেয় ফারহানার মা। ফারহানার রুমে ঠক ঠক করে কেউ একজন আসে। সে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেয়। সে ফারহানার সমস্ত কাপড় খুলে তাকে বিবস্ত্র করে নিজের স্বাদ মিটিয়ে মধ্যরাতে আবার চলে যায়। লোকটি চলে যাওয়ার পর ফারহানার মা বিজি হয়ে যায় মেয়ের জামা কাপড় ঠিক করতে। সকাল সকাল ফারহানার ঘুম ভাঙে।
ডাইনিং রুমে এসে দেখে টেবিলে অনেক টাকা। ফারহানা অত কিছু মাথায় আনল না। তার মাথা ভারী হয়ে আছে। সে ফ্রেস হয়ে নাস্তার টেবিলে বসল। দেখে মা টাকা গুনছে। টাকা গুনতে দেখে সে জিজ্ঞেস করল, এতো টাকা কিসের মা ?
ওই তোর বাবার বন্ধু থেকে কিছু টাকা পেতাম তাই দিয়ে গেল। ফারহানা আর কিছু বলল না। সে রুমে এসে শুয়ে পড়ল। হঠাৎ তার চোখে পড়ল ছেলেদের একটা বেল্ট। তাদের বাসায় কোন পুরুষ মানুষ নেই এই বেল্ট কার ?মনে মনে প্রশ্ন। তার খটকা লাগলো। মাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, দেখ আদিল ফেলে গেল কিনা।
আদিল ?কবে আসল মা ? আগে এসেছিল না কতবার। ফারহানার কেন জানি মায়ের কথায় গরমিল পাচ্ছিল। এই বেল্ট আদিলের হতেই পারেনা। আমি দেখেছি সে কি টাইপ বেল্ট পরে। সারাদিন মা মেয়ে কোন কথা বলল না। রাত হয়ে গেল, তারা ডিনার সারল। মা প্রতিদিনের মতো দুধ নিয়ে এল। ফারহানা চুপ। পরে খাবে বলে রেখে দিল।
মা বলে,খেয়ে নিস বাবুর জন্য দরকার বেশি।
হুমম। দুধটা দেখেই তার বমি আসছিল। তাই সে আজ দুধ খেলোই না।গভীর রাতে মেইন দরজা খোলার আওয়াজ শুনতে পেলো সে। সে দেখে মা দরজা খুলে দিল।একটা পুরুষ মানুষ ঢুকল। সে দেখল মা লাল রঙের নাইটি পরা। নাইটির ভেতরে মায়ের সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দারুণ ভাবে সাজগোছ করা মা। একদম যুবতী মেয়েদের মতো। লোকটি মায়ের রুমে ঢুকল। রাতের বেলা ড্রয়িং রুমের লাইট বন্ধ,তাই চেহেরা ভালো করে ঠাহর করতে পারল না সে। কিন্তু ভাবছে সে, এসব কি, কেন? কিছু একটা ত হচ্ছেই। সে আর না দাঁড়িয়ে শুয়ে ঘুমের ভান ধরল। শোয়ার আগে সে একটা ছুরি তার বালিশের নিচে রাখল। আধা ঘন্টা পরে সেই লোকটা ফারহানার ঘরে ঢুকল। ফারহানার গায়ের চাদর টান দিতেই ফারহানা পেছন থেকে দেখেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল, তারই ভার্সিটির শিক্ষক মাহতাব স্যার।
স্যার আপনি ?
হুমম,যেনেই যখন আজ ফেলেছ তোমার আর রক্ষে নেই বাঁচা। ফারহানার চিৎকার শুনে মা দৌড়ে এলো।
মা এসব কি ?
ওসব কিছু না মা। দেখ স্যার যা বলে কর মা।
তুমি বলছ এসব কথা ? হুমম,আমি বলছি কারণ আমি তোর নিজের মা নই। আমি তোকে এতিমখানা থেকে এনে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছি। অবহেলায় অনাদরে ছিলি। আমি ভালো পরিবেশ দিয়েছি। আর সেই তুই আমার জন্য কষ্ট করতে পারবি না ?
ফারহানা মায়ের কথা শুনে তার পায়ের তলায় মাটি সরে গেলো।
এটাকে ভালো পরিবেশ বলে ? আর জানো মা তুমি এটার চেয়েও বড় কষ্ট কোনটা আজ আমার জন্য জানো ? তুমি বলেছ, তুমি আমার মা নও। আমি এই সত্য মানতে পারছিনা। এটা এতো বছর বলোনি আর আজকে নাই বলতে। আমিও আর চুপ থাকব না মা। দেখ ভালো থাকতে চাইলে এসব করতে হবে।
ফারহানা বলে, মা আমি তোমাকে সুন্দর পরিবেশ দিব। আমি লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করব।
এতো কষ্ট না করে মা এটা সহজ কাজ এটাই করবি তুই। সে বুঝে গেছে মা তাকে ছাড় দিবেনা।
সে আজ কিছু তো একটা করবেই। না নিজের ক্ষতি না যে তার জীবন নষ্ট করেছে তাকে সে শাস্তি দিবে।
সে তার বালিশের নিচে রাখা ছুরিটা বের করে চালিয়ে দিল রক্ষককে। রক্তের ফিনকি তার মুখে এসে রক্তাক্ত করে দিল। ফারহানা হা হা করে হাসল। কাকে বিশ্বাস করব নিজেকে ? না যে জন্ম না দিয়ে মিথ্যা বলে তার নিজের প্রয়োজন মিটিয়েছে শুধু টাকার জন্য তাকে ? আমাদের জীবন আধুনিকতার নামে বিচিত্র হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। সম্পর্কগুলো হারিয়ে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় তুচ্ছ জিনিসের কাছে। সে শুধু হাসছে আর হাসছে অথচ চোখ ছলছল। হুট করে এই অবস্থায় তার ফোনের রিং বেজে উঠল। ফারহানা দেখে, আদিলের কল। সে কলটা কেটে দিয়ে রক্তাক্ত মুখ ধোয়ার জন্য ওয়াশরুমে চলে গেল।