স্পোর্টস রিপোর্টার : শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন মোহনবাগানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট টুটু বসু। মৃত্যু কালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। সোমবার রাতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন শহরের এক নার্সিংহোমে। তখনই জ্ঞান ছিল না তাঁর শেষ পর্যন্ত আর জ্ঞান ফিরল না তাঁর। মঙ্গলবার রাতে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তাঁর সঙ্গেই বাংলার ফুটবল প্রশাসনে শেষ হল একটা যুগের। সোমবার থেকে তাঁকে ভেন্টিলেশনে সারাক্ষণ ডাক্তারদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল।
প্রাক্তন মোহনবাগান সভাপতি বিখ্যাত ছিলেন টুটু বসু নামেই, সবার টুটুদা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী স্বপনসাধন বসু কখন যেন ময়দানের সবার কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।
বেশ কিছুদিন ধরেই কিছু দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। সম্প্রতি তাঁকে ময়দানে, তথা মোহনবাগান ক্লাবেও দেখা যায়নি। সোমবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তাঁর চিকিৎসার জন্য বিশেষ টিমও তৈরি হয়। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে দ্বিতীয়বার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় আর কোনও চিকিৎসাই কাজে লাগেনি। তাঁর পরিবারের তরফে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর প্রয়াণে ময়দানে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আপামর একজন মোহনবাগানী। কতবার যে কঠিন পরিস্থিতি থেকে প্রিয় ক্লাববে একার ক্ষমতায় উদ্ধার করেছে তা হয়তো তিনি নিজেই হিসেব করে বলতে পারতেন না। বাংলার ক্লাব প্রশাসনে তিনি একজন ব্যতিক্রমী মানুষ ছিলেন। ১৯৯১ থেকে প্রায় ৩ দশক প্রত্যক্ষভাবে মোহনবাগান ক্লাব প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন টুটুবাবু। তাঁর সময়ে অনেক উত্থান পতন দেখেছে ক্লাব। কঠিন সময়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন ক্লাবের পক্ষে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্লাবের অন্দরের সমস্যা মিটিয়েছেন দুই পক্ষকে এক করে দিয়ে। মোহনবাগান ক্লাবের দুই প্রশাসক, দুই বন্ধু টুটু, অঞ্জনের অঞ্জন মিত্র আগেই পাড়ি দিয়েছিলেন পরলোকে।
এবার চলে গেলেন টুটু বসুও।এদিন তার বাড়ি, অফিস থেকে ভবানীপুর ক্লাব হয়ে মোহনবাগান ক্লাবে নিয়ে আসা হয় তার দেহ। টুটুকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মোহনবাগান জনতা ভিড় জমায় ক্লাবে। বিধানসভা থেকে ক্লাবে পৌঁছে টুটু বোসকে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে প্রয়াত মহাজীবনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন তিনি। পরে শুভেন্দু বলেন, ”মোহনবাগানের সঙ্গে বাঙালিদের আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে। টুটু বাবু মানেই মোহনবাগান এবং মোহনবাগান মানেই টুটু বাবু। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এবং নিজে আমি ক্লাবে এসেছিলাম তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে। আমার সঙ্গে ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক ছিলেন, ক্লাবকর্তারাও ছিলেন। মোহনবাগান সমর্থক, টুটু বাবুর শুভাকাঙ্খীদের সমবেদনা জানাই। সমর্থকদের কাছে আবেদন, টুটু বাবু যেভাবে দলটাকে আগলে রেখেছিলেন, আপনারাও আগলে রাখুন। তাঁর চলে যাওয়া অনেক বড় ক্ষতি।”
রাজ্যের ক্রীড়া মন্ত্রী নিশীথ প্রামানিকও শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, অপরিসীম ক্ষতি। ‘রাজনৈতিক জগতের ব্যক্তিত্ব শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, স্বপন দাশগুপ্ত, বিমান বসু, ববি হাকিম, অতীন ঘোষ-সহ আরও অনেকে উপস্থিত হয়েছিলেন। টুটু বোসের প্রয়াণ সংবাদ মিলিয়ে দিয়েছে রাজনীতি,খেলা এবং সিনেজগতকেও। প্রাক্তন ফুটবলার সুব্রত ভট্টাচার্য, সত্যজিৎ চট্টোপাধ্যায়, শিশির ঘোষ, অমিত ভদ্র, রঞ্জন ভট্টাচার্য-সহ আরও অনেকে শেষ দেখায় এসেছিলেন টুটু বোসের বাসভবনে। ফেডারেশন প্রেসিডেন্ট কল্যাণ চৌবে, তাঁর স্ত্রী সোহিনী চৌবে-সহ আরও অনেকে উপস্থিত হয়েছিলেন। সিএবি-র তরফ থেকেও শোকজ্ঞাপন করা হয়েছে। এসেছিলেন মহমেডান স্পোর্টিংয়ের কর্তারাও। সকলের চোখেমুখেই ছিল গভীর শোক আর প্রিয় মানুষটিকে হারানোর বেদনা।সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ জানালেন ক্লাবের খারাপ সময়ে জানতাম টুটু দা আছে সামলে নেবে।’বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু বললেন, রাজনীতির ব্যাপার থেকে দূরে গিয়ে আমরা বন্ধু ছিলাম। মিশুকে মানুষ। কালে ভদ্রে দেখা হত তবুও আন্তরিক সম্পর্ক ছিল আমাদের।’
একদা ঘরের ছেলে বলে পরিচিত সুব্রত ভট্টাচার্যের সঙ্গে টুটু বোসের সম্পর্ক ছিল গভীর। এদিন কার্যত তিনি হয়ে গিয়েছিলেন বাকরুদ্ধ। স্মৃতি হাতড়ে বলছিলেন, ”আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে গিয়েছেন ক্লাবের উন্নতির জন্য। আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে গিয়েছেন। উনি চলে গেলেন। এখন একটু দুশ্চিন্তায় রয়েছি। অনেক স্মৃতি ভিড় করছে। ওঁর মাঠে আসা প্রেরণায় পরিণত হত। বড় ক্ষতি তো বটেই, পরিবারের আরও বড় ক্ষতি হয়ে গেল।”
মোহনবাগানের সভাপতি দেবাশিস দত্ত বলেন, ”আমার সঙ্গে টুটুদার পরিচয় দীর্ঘদিনের। আমাদের সম্পর্কটা ছিল বন্ধুর মতো। আমার বাবাকে হারিয়েছি। সেই দিক থেকে বলতে গেলে টুটুদা, অঞ্জনদা ছিলেন আমার অভিভাবক। আজ আমি অভিভাবকহীন হলাম।”
ইস্টবেঙ্গল শীর্ষকর্তা দেবব্রত সরকার বললেন, একটা ক্যারেক্টর ছিলেন। একটা বই লেখা যাবে এত ঘটনা পক্ষে বিপক্ষে। মোহনবাগান ক্লাবের অপরনীয় ক্ষতি। এমন ক্যারেক্টর আরও আসুক ময়দানে।’