নয়ন বিশ্বাস রকি
বর্তমানে বাংলাদেশের জেলা প্রশাসকরা সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে দেশজুড়ে গভীর প্রশ্ন, সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। রাজপথ থেকে চায়ের দোকান, সবখানেই একটাই আলোচনা: আমরা কোন পথে হাঁটছি ?
- শাসনব্যবস্থার মডেল নিয়ে উদ্বেগ
সরকার কি পাকিস্তান মডেলের দিকে যাচ্ছে? নাকি এটি একটি সেনা-সমর্থিত সরকারেরই প্রতিচ্ছবি? ইতিহাস সাক্ষী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সেনাবাহিনীর একটি সমর্থনকারী ভূমিকা ছিল। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে জাতি জানতে চায়, আমরা কি আবার সেই একই বাস্তবতায় ফিরে যাচ্ছি?
- সংবিধান ও আইন কী বলে ?
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬১ অনুযায়ী, “বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগসমূহের সর্বাধিনায়কতা রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত হইবে এবং আইনের দ্বারা তাহার প্রয়োগ নিয়ন্ত্রিত হইবে।” এই প্রতিরক্ষার মূল লক্ষ্য বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা।
আবার অনুচ্ছেদ ৭ এ সুস্পষ্ট বলা আছে, “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।” জনগণের এই ক্ষমতা প্রয়োগ হবে কেবল সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে।
বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সেনা মোতায়েনের বিধান রয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ১২৯ থেকে ১৩২ ধারায় এবং সেনা আইন, ১৯৫২ এ। কিন্তু এই আইনগুলোতে স্পষ্ট বলা আছে, এটি একটি “Aid to Civil Power” অর্থাৎ বেসামরিক ক্ষমতাকে সহায়তা। এটি সাময়িক, জরুরি এবং সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে। স্থায়ীভাবে বেসামরিক প্রশাসনের বিকল্প হওয়া বা সমান্তরাল প্রশাসন চালানো এই আইনের উদ্দেশ্য নয়।
- সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও ঝুঁকি
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বা বেসামরিক প্রশাসনের দৈনন্দিন কাজ তাদের নিয়মিত দায়িত্ব নয়। এসব কাজের জন্য পুলিশ, র্যাব, আনসারসহ সুনির্দিষ্ট বাহিনী রয়েছে।
সেনা আইন, ১৯৫২ এর অধীনে সেনা সদস্যদের প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড সম্পূর্ণ যুদ্ধকেন্দ্রিক। দীর্ঘদিন মাঠ পর্যায়ে বেসামরিক দায়িত্ব পালন করলে বাহিনীর মূল যুদ্ধ-প্রস্তুতি, নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং জনগণের কাছে অর্জিত ঐতিহ্য ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যে সুনাম, তা এই পেশাদারিত্বের কারণেই।
- সাম্প্রতিক অতীত ও জনমনে প্রশ্ন
জাতি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পূর্ববর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রত্যক্ষ করেছে। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদানের পর তাদের ভূমিকা নিয়েও জনগণের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৬ অনুযায়ী নির্বাহী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অ্যাটর্নি-জেনারেলকে সহায়তা করা এবং অনুচ্ছেদ ১৪৫ক তে চুক্তির বিষয় থাকলেও, বেসামরিক প্রশাসনে সেনাবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
যেভাবেই হোক একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও সেনাবাহিনী কেন এখনো মাঠ পর্যায়ে? সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৭(৩)অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ বা সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরও মন্ত্রিসভা কার্যভার চালাতে পারে, কিন্তু সেখানে সেনাবাহিনীর স্থায়ী ভূমিকার কথা বলা নেই।
- জনগণের অর্থ ও জবাবদিহিতা
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বেতন-ভাতা আসে জনগণের কষ্টার্জিত আয়কর থেকে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮৩অনুযায়ী, কোনো কর সংসদের আইন ছাড়া আরোপ করা যাবে না। অর্থাৎ জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। সুতরাং জনগণের একটি বৈধ প্রশ্ন: তারা কি সেনা-সমর্থিত সরকার দ্বারা দেশ পরিচালনার জন্য সমর্থন দিয়েছে?
- জাতির প্রত্যাশা
দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা হলো, সরকারকে অবিলম্বে এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
স্বচ্ছতা কোন আইনি কাঠামোয়, কত দিনের জন্য জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সমন্বয় চলবে, তা জাতির সামনে প্রকাশ করতে হবে। এটি কি সেনা আইন, ১৯৫২ এর ৩ নং ধারার অধীন, নাকি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩১ ধারারঅধীন — তা পরিষ্কার করতে হবে। ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন, বেসামরিক প্রশাসনকে স্বাভাবিক ও কার্যকর করে দ্রুততম সময়ে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। পেশাদারিত্ব রক্ষা, সেনাবাহিনীকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব অনুচ্ছেদ ৬১ মোতাবেক পালন করার সুযোগ দিয়ে বাহিনীর মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে।
জনগণের ম্যান্ডেট: সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১*তে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্র হবে গণতন্ত্র। দেশ পরিচালনার জন্য জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।
সেনাবাহিনী আমাদের গর্ব, আমাদের আস্থার শেষ ঠিকানা। তাদের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা রক্ষা করা রাষ্ট্র ও জনগণ সবারই দায়িত্ব। জাতি আশা করে, রাষ্ট্র সংবিধান ও আইনের পথে থেকেই জনমনের সংশয় দূর করবে। কারণ দিনশেষে, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক বাংলাদেশের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজসেবক